বন্যার পানি কমলেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, খাদ্য-বিদ্যুৎ সংকট, মানবেতর জীবন

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৯ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশে পানি কিছুটা কমলেও দুর্ভোগ কমেনি। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে লাখো মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। অনেক বাড়িতে এখনো রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অসংখ্য পরিবার শুকনো খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত থাকায় ত্রাণ পৌঁছানো এবং জরুরি সেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার পর্যন্ত চট্টগ্রামের ১৭৬টি ইউনিয়নের ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবারের ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গত রোববার থেকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা। উপজেলার প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এখনো পানির নিচে। চার লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপজেলা পরিষদ, থানা চত্বর, আদালত ও পৌরসভা কার্যালয়েও এখনো বন্যার পানি রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় অনেক এলাকা অন্ধকারে রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির সংকটের পাশাপাশি ঘরে পানি থাকায় অনেক পরিবার রান্না করতে পারছে না।

বাঁশখালীর ছনুয়া, পুঁইছড়ি, শেখেরখীল, সরল, কাহারঘোনাসহ পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় এখনো পানি নামেনি। সাগরের জোয়ার ও পাহাড়ি ঢলে বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় রান্নার চুলা জ্বালানো যাচ্ছে না। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রায় চার হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও দেড় হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনও ত্রাণ বিতরণ করছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, এসব সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

চন্দনাইশেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। দুই পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল এখনো পানির নিচে রয়েছে। প্রায় অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দি। বন্যায় প্রায় ২ হাজার ২০০ হেক্টর আউশ ধান, ৯০০ হেক্টর বিভিন্ন সবজি ও ৭০ হেক্টর পেঁপে ক্ষেত তলিয়ে গেছে। পাঁচ শতাধিক পুকুর ও মাছের প্রজেক্ট ডুবে মাছ ভেসে যাওয়ায় অন্তত ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো ব্যাহত রয়েছে।

দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা জানান, পানি কিছুটা কমলেও দুর্ভোগ কমেনি। অনেক এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ নেই, ঘরে পানি থাকায় রান্না করা যাচ্ছে না। বিশুদ্ধ পানির সংকটের পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় প্রয়োজনীয় খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সাতকানিয়ার চরতি ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. নুরুল ইসলাম বলেন, চার দিন ধরে ঘরে পানি। রান্না করতে পারছি না। শুকনো খাবার যা ছিল শেষ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে শিশুদের নিয়ে খুব কষ্টে থাকতে হচ্ছে।

বাঁশখালীর ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা বেলাল উদ্দিন বলেন, ঘরে এখনো পানি। চুলা জ্বালানোর উপায় নেই। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। বিশুদ্ধ পানিও পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা সরকারি কোনো সহায়তা পাইনি।

চন্দনাইশের বাসিন্দা আবদুল কাদের বলেন, ফসল ও মাছের ঘেরের ক্ষতির কারণে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণ, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। যেসব এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত, সেখানে বিকল্প উপায়ে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন বিশ্বাস বলেন, পানি কিছুটা কমলেও অনেক এলাকায় মানুষ এখনো পানিবন্দি। আশ্রয়কেন্দ্র ও দুর্গত এলাকায় নিয়মিত ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।


আমার বার্তা /জেএইচ