দেশেই চালু হচ্ছে লিভার ট্রান্সপ্লান্টসহ বিশ্বমানের গ্যাস্ট্রো চিকিৎসা
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮:৪৩ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

লিভার ট্রান্সপ্লান্টের মতো জটিল ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার জন্য এতদিন দেশের রোগীদের বিদেশমুখী হতে হলেও সেই বাস্তবতা বদলাতে যাচ্ছে। বাংলাদেশেই অচিরেই চালু হচ্ছে লিভার ট্রান্সপ্লান্টসহ বিশ্বমানের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি চিকিৎসাসেবা। একইসঙ্গে প্যানক্রিয়াটিক স্টোনের আধুনিক চিকিৎসা, ক্যান্সারে অঙ্গসংরক্ষণকারী থেরাপি ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির একাধিক বিশ্বমানের সেবা সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সোসাইটি।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সোসাইটির ৩১তম বার্ষিক সম্মেলন ও বৈজ্ঞানিক সেমিনারে দেশের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও লিভার রোগ চিকিৎসায় সাম্প্রতিক অগ্রগতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং বিদেশ নির্ভরতা কমানোর রোডম্যাপ তুলে ধরা হয়।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (মেডিকেল এডুকেশন) অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. ফজিলা-তুন-নেছা মালিক।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম মোহছেন। সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক ডা. দেওয়ান সাইফুদ্দিন আহমেদসহ সোসাইটির সদস্য, দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং গবেষকরা এতে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান বলেন, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিজনিত রোগ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই একটি বড়ো জনস্বাস্থ্য সমস্যা। লিভার রোগ, পরিপাকতন্ত্রের জটিল রোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস্ট্রো সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
তিনি বলেন, উন্নত চিকিৎসা শুধু রাজধানী বা বড়ো শহরকেন্দ্রিক হলে চলবে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিজনিত রোগের উন্নত ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে হবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরি করা জরুরি। চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও সাপোর্ট স্টাফ—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, চিকিৎসা গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তির সমন্বয় ছাড়া এই খাতে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম তার বক্তব্যে বলেন, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও লিভার রোগ চিকিৎসায় চিকিৎসকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু চিকিৎসা নয়, নির্ভুল রোগ নির্ণয়, আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োগ, প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং ক্লিনিক্যাল অডিট—সবকিছুর ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল থাকলে দেশের চিকিৎসকরা আন্তর্জাতিকমানের সেবা দিতে সক্ষম। এজন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং প্রশাসনিক সহায়তা।
সম্মেলনে জানানো হয়, লিভার সিরোসিসসহ লিভারের বিভিন্ন অ্যান্ড-স্টেজ রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য দেশে বড়ো পরিসরে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতদিন এই চিকিৎসার জন্য রোগীদের বাধ্য হয়ে বিদেশে যেতে হতো।
বাংলাদেশ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সোসাইটির উদ্যোগ এবং বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিক সহযোগিতায় সেই নির্ভরতা কমতে যাচ্ছে। সরকার এরইমধ্যে লিভার প্রতিস্থাপনের অবকাঠামো উন্নয়নে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং সার্জিক্যাল সেটআপ প্রস্তুতের কাজ এগোচ্ছে।
এর আগে শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় বিজয় সরণির মিলিটারি মিউজিয়াম এম্ফিথিয়েটারে অনুষ্ঠিত প্রি-কনফারেন্সে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম বলেন, বাংলাদেশে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট কার্যক্রম অবশ্যই সফল করতে হবে। এটি কোনো বিকল্প নয়, এটি সময়ের দাবি। তিনি বলেন, দেশের মানুষের জন্য এই সেবা নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য একটাই—দেশের রোগীদের যেন চিকিৎসার জন্য প্রতিবেশী দেশ বা অন্য কোথাও যেতে না হয়।
সম্মেলনের বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে দক্ষ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ও লিভার রোগ বিশেষজ্ঞের অভাব নেই। আধুনিক যন্ত্রপাতি, সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা কমানো এবং প্রশিক্ষণের পর চিকিৎসকদের কাজ করার সুযোগ তৈরি করা গেলে এই খাতে বিপ্লব সম্ভব। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও লিভার রোগ চিকিৎসার জন্য আর কোনো বাংলাদেশিকে বিদেশে যেতে হবে না।
আমার বার্তা/এমই
