বিএমইউতে উচ্চ রক্তচাপ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বৈজ্ঞানিক সেমিনার অনুষ্ঠিত
প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬, ১৯:০১ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস ২০২৬ কে সামনে রেখে ‘হাইপারটেনশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি সায়েন্টিফিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (১৬ মে) বিএমইউ এর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লেকচার হলে ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স এর উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে দেশের উচ্চ রক্তচাপ পরিস্থিতি, প্রতিরোধ, চিকিৎসা, ওষুধ সরবরাহ ও বাজেট বৃদ্ধি এবং বহুমুখী সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সাথে বক্তারা নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপকে হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউ এর মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ. এম. সিদ্দিকী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ। সেমিনারের অংশ হিসেবে ‘হাইপারটেনশন প্রিভেনশন ইন বাংলাদেশ: ইমাজিং চ্যালেঞ্জেস এন্ড ফিউচার ডাইরেকশন (Hypertension Prevention in Bangladesh: Emerging Challenges and Future Direction)’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উম্মোচন করা হয়। আগামীকাল ১৭ মে অনুষ্ঠিতব্য উচ্চ রক্তচাপ দিবসের প্রতিপাদ্য হলো “একসাথে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ (Controlling Hypertension Together) ”।
বিএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ. এম. সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ২১ থেকে ২৩ শতাংশ মানুষ হাইপারটেনশনে ভুগছেন, তবে এর মধ্যে মাত্র ১৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি দীর্ঘস্থায়ী কার্যকারিতাসম্পন্ন ওষুধ ব্যবহারের পাশাপাশি দেশের ড্রাগ পলিসি আরও উন্নত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আরো বলেন, উচ্চ রক্তচাপ হার্ট, কিডনী, ব্রেইন, রক্তনালী, চোখসহ পাঁচটি অর্গানের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে অর্থাৎ উচ্চ রক্তচাপ এই পাঁচটি অর্গানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপুর্ণ। এ অবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ড্রাগ পলিসি নির্ধারণ করা জরুরি। কোন ওষুধ দীর্ঘক্ষণ কাজ করে, কোন ওষুধ সেবনে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের সাথে সাথে এফেক্টেড অর্গানগুলোকেও সেভ করে সেটাও বিবেচনা রাখতে হবে। আজেকের এ আয়োজন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে হেলথ কেয়ার পলিসিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
সেমিনারে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মোঃ আবুল কালাম আজাদ বলেন, উচ্চ রক্তচাপ শুধু হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় না, এটি ধীরে ধীরে শরীরের রক্তনালীর স্বাভাবিক কার্যকারিতা নষ্ট করে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি করে। তিনি জানান, গবেষণায় দেখা গেছে, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ পুরুষদের মধ্যে ইরেক্টাইল ডিসফাংশনের মতো সমস্যার কারণ হতে পারে, যা ভবিষ্যৎ হৃদরোগের আগাম সতর্কসংকেত। তিনি নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, ধূমপান বর্জন এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ওষুধের দাম কমানো যেমন জরুরি একই সাথে যে ধরণের ওষুধ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অধিক কার্যকর সেটা বিবেচনায় নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এই আয়োজনের উদ্দেশ্য হলো সচেতনতা বৃদ্ধি করা, রোগ নির্ণয়ের হার উন্নত করা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং মৃত্যুর ঝুঁকি কমানোর জন্য জীবনযাত্রার পরিবর্তনে উৎসাহিত করা। প্রাথমিক পর্যায়ে রক্তচাপ শনাক্তকরণ এবং তা দীর্ঘস্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা। বিশ্বজুড়ে ৩০-৭৯ বছর বয়সী প্রায় ১.৪ বিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত, যাদের অর্ধেকেরও বেশি শনাক্ত হন না।
এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হেলথ সার্ভিস ডিভিশনের অতিরিক্ত সচিব জনাব মোমেনা মনি, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার।
অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি বলেন, উচ্চ রক্তচাপ মানুষের উপর একটি সংকট তৈরি করেছে। এটা শুধু রোগীর ব্যক্তিগত বিষয় নয়। বর্তমানে ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সে ২৮ শতাংশ মানুষ বা আড়াই কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। তরুণদের মধ্যেও রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে মারা যাচ্ছে। কিশোর কিশোরীরা প্রি হাইপার টেনশনে ভুগছে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, মানসিক চাপ ও তামাক ব্যবহার তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। উচ্চ রক্তচাপ সমস্যা এখন মানুষের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার বলেন, নগরায়ন ধুমপান, বায়ুদুষণ, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভাস, মানসিক চাপ, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া ইত্যাদি উচ্চ রক্তচাপের কারণ। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে বহুমুখী ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
সেমিনারে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন প্রফেসর ডা. মো. আতিকুল হক, চেয়ারম্যান ডিপার্টমেন্ট অফ পাবলিক হেল্থ এন্ড ইনফরমেটিক্স এবং ডীন, প্রিভেন্টিভ এন্ড সোশ্যাল মেডিসিন, বিএমইউ।
হেল্থ সার্ভিস ডিভিশনের যুগ্ম সচিব জনাব মামুনুর রশিদ তার বক্তব্যে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল রিপোর্ট অন হাইপারটেনশন ২০২৫ অনুযায়ী, আক্রান্ত মানুষের একটি বড় অংশ এখনও তাদের রোগ সম্পর্কে সচেতন নয়। তাই জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জনগণকে শিক্ষিত করা অত্যন্ত জরুরি।
আলোচনায় প্রফেসর জাকির হোসেন বলেন, দেশে ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ হাইপারটেনশনে আক্রান্ত এবং আক্রান্তদের মধ্যে ৪৪ শতাংশ এখনও শনাক্ত হয়নি। এছাড়া দেশের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের একটি সীমিত অংশ এনসিডি খাতে বরাদ্দ থাকায় প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) এর ডিজিএম মোহাম্মদ রিয়াদ আরেফিন বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনসিডি ওষুধ ক্রয়ের বাজেট না থাকায় কিছু সময় ওষুধ সরবরাহ বন্ধ ছিল, যা পরবর্তীতে পুনরায় চালু হয়েছে। তিনি বলেন, কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় বলে আগাম চাহিদা জানা থাকলে সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হয়।
আলোচনায় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে দেশের ৩১০টি উপজেলায় গ্রামীণ জনগণকে সেবা দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, রোগীদের ওষুধ সরবরাহের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
ন্যাশনাল টোব্যাকো কন্ট্রোল সেলের মহাপরিচালক জনাব মোঃ আখতারউজ-জামান বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ শুধুমাত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়; এটি একটি বহুমুখী সমন্বিত উদ্যোগ।
ইডিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ এ সামাদ মৃধা বলেন, সরকারের ওষুধের মোট চাহিদার বড় একটি অংশ ইডিসিএল সরবরাহ করে থাকে। ডলারের দাম বৃদ্ধি সত্ত্বেও ইডিসিএল ৪৮টি ওষুধের দাম কমিয়েছে। এটা ছিল একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। ওষুধের দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল একটি বিশেষ সিন্ডিকেট যা ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। রোগীসহ সাধারণ মানুষকে স্বল্প ও সুলভ মূল্যে ওষুধ সরবরাহ করতে ইডিসিএল অঙ্গীকারাবদ্ধ।
হেলথ ইকোনমিক্স ইউনিটের মহাপরিচালক ডা. মো. এনামুল হক স্বাস্থ্যখাতে কার্যকর ফাইন্যান্সিং স্ট্র্যাটেজি এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দক্ষ পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞ নিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান, শিক্ষক, গবেষক এবং পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা তৃণমূল পর্যায়ে উচ্চরক্তচাপের বিনামূল্যে ওষুধ নিশ্চিত করা, শক্তিশালী ইন্টারভেনশন পলিসি এবং সচেতনতামূলক ক্যম্পেইন এর মাধ্যমে এই নীরব ঘাতক ব্যাধি প্রতিরোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অনুষ্ঠানটির সার্বিক সহযোগিতা করেন জনাব রুহুল কুদ্দুস, বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড, গ্লোবাল হেল্থ এডভোকেসি ইনকিউবেটর (GHAI) । অনুষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পাদনে সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করেন ডিপার্টমেন্ট অফ পাবলিক হেল্থ এন্ড ইনফরমেটিক্স এর গবেষণা দলের সদস্য তানজিলা বুশরা, শাহানা সুলতানা, কৃতিকা অর্চি, অর্ণা চৌধুরী, মুক্তা দাস, আশিকুর রহমান মল্লিক ও মোহন চক্রবর্তী।
আমার বার্তা/এমই
