দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালানোর ফলে ঘাড় ও কোমর ব্যথা প্রতিরোধের উপায়
প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬, ১০:০৯ | অনলাইন সংস্করণ
ডা. এম ইয়াছিন আলী

বর্তমান সময়ে ব্যক্তিগত গাড়ি, অফিস যাতায়াত, পেশাগত ড্রাইভিং কিংবা দীর্ঘ ভ্রমণের কারণে অনেক মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালাতে হয়। টানা দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকার ফলে ঘাড়, কাঁধ, পিঠ ও কোমরে ব্যথা হওয়া একটি খুবই সাধারণ সমস্যা। বিশেষ করে যারা প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ড্রাইভ করেন, তাদের মধ্যে এই সমস্যা আরও বেশি দেখা যায়। তবে কিছু সহজ অভ্যাস ও সতর্কতা মেনে চললে এই ব্যথা অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
প্রথমত, সঠিক বসার ভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাড়ি চালানোর সময় সিট এমনভাবে সেট করতে হবে যাতে মেরুদণ্ড সোজা থাকে এবং কোমর ভালোভাবে সাপোর্ট পায়। সিট খুব বেশি পিছনে বা সামনে হলে শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। হাঁটু সামান্য বাঁকা থাকবে এবং পা সহজে প্যাডেলে পৌঁছাতে পারবে—এভাবে সিট ঠিক করা উচিত। কোমরের পেছনে ছোট একটি লাম্বার সাপোর্ট বা কুশন ব্যবহার করলে কোমরের চাপ কমে।
দ্বিতীয়ত, স্টিয়ারিং ধরার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই কাঁধ উঁচু করে বা হাত অতিরিক্ত টানটান করে স্টিয়ারিং ধরেন, যা ঘাড় ও কাঁধের পেশিতে চাপ সৃষ্টি করে। কাঁধ শিথিল রেখে এবং কনুই সামান্য বাঁকা অবস্থায় স্টিয়ারিং ধরা উচিত। এতে ঘাড়ের পেশি অতিরিক্ত টান থেকে রক্ষা পায়।
তৃতীয়ত, একটানা দীর্ঘ সময় গাড়ি না চালিয়ে মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়া জরুরি। প্রতি ১ থেকে ২ ঘণ্টা পর অন্তত ৫ থেকে ১০ মিনিটের বিরতি নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে একটু হাঁটা, শরীর স্ট্রেচ করা এবং ঘাড়-কোমর হালকা নড়াচড়া করা উচিত। এতে রক্ত সঞ্চালন ভালো হয় এবং পেশির শক্তভাব কমে যায়।
চতুর্থত, নিয়মিত ব্যায়াম খুবই কার্যকর। ঘাড়, কোমর ও পিঠের পেশি শক্তিশালী রাখার জন্য প্রতিদিন হালকা স্ট্রেচিং, হাঁটা, যোগব্যায়াম বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম করা দরকার। বিশেষ করে কোর মাসল শক্তিশালী থাকলে কোমরের ব্যথা কম হয়।
পঞ্চমত, দীর্ঘক্ষণ ড্রাইভিংয়ের আগে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া উচিত। ক্লান্ত শরীরে গাড়ি চালালে শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকি নয়, পেশির টানও বেড়ে যায়। পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম শরীরকে আরাম দেয় এবং ব্যথার সম্ভাবনা কমায়।
ষষ্ঠত, মোবাইল ফোন কাঁধে চেপে কথা বলা বা গাড়ি চালানোর সময় মাথা একদিকে ঝুঁকিয়ে রাখা থেকে বিরত থাকতে হবে। এতে ঘাড়ের পেশিতে অসম চাপ পড়ে এবং সার্ভাইক্যাল সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে।
সবশেষে, যদি ঘাড় বা কোমরের ব্যথা দীর্ঘদিন ধরে থাকে, হাত-পায়ে ঝিনঝিনি অনুভূত হয়, অবশ লাগে অথবা ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকে, তাহলে অবহেলা না করে দ্রুত একজন ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মনে রাখতে হবে, গাড়ি চালানো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ হলেও ভুল অভ্যাসের কারণে তা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই সচেতনতা, সঠিক ভঙ্গি এবং নিয়মিত ব্যায়ামই পারে ঘাড় ও কোমর ব্যথা থেকে আমাদের সুরক্ষিত রাখতে।
লেখকঃ ডা. এম ইয়াছিন আলী
ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ
চীফ কনসালটেন্ট
ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল
ধানমন্ডি, ঢাকা।
