গবেষকের কৃতিত্ব ছিনিয়ে নিল এআই?
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৫০ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

এআই’র আধিপত্য নাকি মানুষের সাধনা; এই দ্বন্দ্বে গণিত জগতে এখন বইছে বড় ঝড়। তাত্ত্বিক গণিতের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কঠিনতম সমস্যাগুলোর একটি 'নাভিয়ার-স্টোকস' সমস্যার সমাধানের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন প্রিন্সটন ও নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ট্রিস্টান বাকমাস্টার এবং অ্যানথ্রপিকের গবেষক লেভেন্ট আলপোজে। তাদের আশা ছিল, আর মাত্র এক মাসের কঠোর প্রচেষ্টায় এই ঐতিহাসিক সমীকরণের পূর্ণাঙ্গ সমাধান মেলে ধরা সম্ভব হবে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ওপেনএআই’র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত শত শত এআই এজেন্ট তাদের সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত আবিষ্কারকে ছিনিয়ে নিয়েছে।
গত মাসে মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেমসের অন্তর্ভুক্ত এই জটিল সমীকরণটি নিয়ে কাজ করছিলেন বাকমাস্টার ও আলপোজে। আন্তর্জাতিক গণিত সংস্কারের ক্ষেত্রে ক্লে ম্যাথমেটিক্স ইনস্টিটিউট ঘোষিত ১০ লাখ ডলার পুরস্কারের এই সমস্যাটির সমাধান যেকোনো গবেষককে রাতারাতি গণিত জগতের বৈশ্বিক তারকায় পরিণত করার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তাদের সেই রোমাঞ্চকর পথচলায় আচমকা বাধা হয়ে দাঁড়ায় চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই। বিশ্বজুড়ে অনলাইনে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক হয়তো মিলেনিয়াম প্রাইজের কোনো সমস্যার সমাধানে সফল হতে চলেছে। সেই গুঞ্জনের জের ধরেই গত ১ সেপ্টেম্বর ওপেনএআই তাদের একাধিক এআই এজেন্ট মাঠে নামায়। মাত্র চার দিনের ব্যাপক কম্পিউটিং এবং ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকায় কাজ করা স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টদের মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ বার বার্তা আদান-প্রদানের পর গত মঙ্গলবার ওপেনএআই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয় যে তারা নাভিয়ার-স্টোকস সমীকরণটির সমাধান করে ফেলেছে।
প্রতিষ্ঠানটির এই সাফল্য উদযাপনে কোনো আত্মম্ভরিতার কমতি ছিল না। শেয়ারবাজারে যাওয়ার প্রস্তুতি এবং অ্যানথ্রপিককে টেক্কা দেওয়ার লড়াইয়ে এটি তাদের জন্য এক বিশাল ট্রাম্পকার্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই বিশাল সাফল্যের পর ওপেনএআই’র প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের উচ্ছ্বাসের কথা জানিয়ে লেখেন, 'ওপেনএআই-এর ইতিহাসে আমার জন্য সবচেয়ে আশ্চর্যজনক মুহূর্তগুলোর একটি ছিল গত সপ্তাহে এর বাস্তব রূপ দেখা।' এখানেই শেষ নয়, ওপেনএআই-এর মুখপাত্র লরেন্স ফুকোনেট আরও বড় চমকের ইঙ্গিত দিয়ে জানান, নাভিয়ার-স্টোকস সম্পন্ন করার পর থেকে আমরা আরেকটি মিলেনিয়াম প্রাইজ সমস্যার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। আমরা কীভাবে চিন্তাশীলভাবে এই ফলাফলগুলো সবার সাথে শেয়ার করব তা নিয়ে কাজ করছি।
এই ঘটনার পর চরম হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হয়েছেন বাকমাস্টার ও তার সহকর্মী। সাক্ষাৎকারে বাকমাস্টার তার দীর্ঘদিনের স্বপ্নের কথা স্মরণ করে আক্ষেপের সাথে বলেন, আমার মনে হয় মানুষ বিষয়টিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করে যেন নাভিয়ার-স্টোকস সমস্যা সমাধান করাই ছিল আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। বিষয়টি মোটেও তা ছিল না... আমি কেবল এই ইতিহাসের অংশ হতে চেয়েছিলাম।
উল্লেখ্য, এই যুদ্ধ সম্পূর্ণ মানুষ বনাম যন্ত্রের প্রথাগত লড়াই ছিল না; বাকমাস্টার এবং আলপোজে নিজেরাও তাদের গবেষণার গতি বাড়াতে বাণিজ্যিক এআই মডেল ব্যবহার করছিলেন। তবে ওপেনএআই-এর এই চরম আগ্রাসনে গণিতের মৌলিক সংজ্ঞা নিয়েই প্রশ্ন উঠে গেছে। মডেলগুলো যেভাবে মানুষের চিন্তার দক্ষতাকে টপকে গেছে, তা গবেষকদের স্তম্ভিত করেছে। এর পাশাপাশি এক গভীর বিতর্কের জন্ম হয়েছে; এটি কি আদৌ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, নাকি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি? বাকমাস্টার সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন যে, তিনি যখন সমস্যাটি সমাধানের কাজ করছিলেন, তখন ওপেনএআই-এর মডেলগুলো হয়তো অন্যায্যভাবে তার চ্যাটজিপিটিতে দেওয়া ইনপুট এবং তথ্যে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিল।
ওপেনএআই অবশ্য বাকমাস্টারের এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের মুখপাত্র লরেন্স ফুকোনেট স্পষ্ট ভাষায় জানান, তদন্তের পর আমরা সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে গত ৩ জুলাইয়ের পর কোনো ব্যবহারকারীর ইনপুট কোনোভাবেই এই সিস্টেমকে প্রভাবিত করতে পারেনি। পরে তিনি আরও যোগ করেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে পারি যে গত দুই মাসে ড. বাকমাস্টারের কোডেক্স প্রম্পটগুলো কোনোভাবেই সিস্টেম বা প্রশিক্ষণকে প্রভাবিত করেনি। যদিও প্রাতিষ্ঠানিক এই তদন্তের দাবির পর বাকমাস্টার সংক্ষিপ্ত ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় সরাসরি বলেন, আমি তাদের বিশ্বাস করি না।
তাত্ত্বিক গণিতের ধীরস্থির ও সহযোগিতামূলক ধারার সাথে সিলিকন ভ্যালির বাণিজ্যিক এবং দ্রুত ফলাফলের সংস্কৃতির এই সংঘর্ষ নিয়ে এখন তীব্র সমালোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক গণিত সমাজ ওপেনএআই-এর তৈরি করা ১৬৬ পৃষ্ঠার জটিল সমাধান খসড়াটি এখনো খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছে। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের বুদ্ধি বা তাত্ত্বিক বোঝাপড়ার ভূমিকা কতটা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। ওপেনএআই-এর নিজস্ব গবেষক সেবাস্তিয়ান বুবেক স্বীকার করেছেন, তাদের টিমের গণিতবিদদের কারোই এই তরল গতিবিদ্যার ওপর উচ্চতর পর্যায়ের গভীর দক্ষতা ছিল না, যার ফলে তারা 'এর গাণিতিক বিষয়বস্তুতে অর্থপূর্ণ কোনো অবদান রাখতে পারেননি।' মূলত কম্পিউটারের লজিক্যাল প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করে এআই-এর তৈরি করা যুক্তিগুলোর সঠিকতা পরীক্ষা করা হয়েছে।
এই ধরনের আত্মাহীন ও অবোধ্য সমাধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীরা। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির নাভিয়ার-স্টোকস বিশেষজ্ঞ হাভিয়ের গোমেজ-সেরানো বলেন, সাধারণ প্রক্রিয়ায় এমন একটি আবিস্কার আন্তর্জাতিক জার্নালে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে অন্ততঃ এক বা দুই বছর সময় লাগে। ওপেনএআই-এর পেশ করা কাগজপত্র বিশ্লেষণ করে তিনি মন্তব্য করেন, আমার মনে হয় না গণিত সমাজ এই খসড়াটি যেভাবে আছে সেভাবেই গ্রহণ করবে। এটি সম্পূর্ণ অবোধ্য।
ইতিমধ্যে ওপেনএআই এবং বাকমাস্টারের ব্যক্তিগত যোগাযোগেও নানা টানাপোড়েন দেখা দেয়। গত ৩ সেপ্টেম্বর এআই এজেন্ট কাজ করার সময়ই বাকমাস্টার ওপেনএআই-এর সাথে ইমেইলে যোগাযোগ করেন। এরপর ওপেনএআই-এর বুবেক তাকে পরামর্শ দেন তিনি যেন ওপেনএআই-এর সাথে যুক্ত হয়ে যৌথভাবে এই প্রমাণের কৃতিত্ব নেন। তবে আলপোজে অ্যানথ্রপিকের সাথে যুক্ত থাকায় ওপেনএআই এই প্রজেক্টে তাকে বাদ দেওয়ার শর্ত এনেছিল। কিন্তু বাকমাস্টার নিজের সহকর্মীর বিশ্বাস ভঙ্গ করতে অস্বীকার করে বলেন, তিনি কোনোভাবেই 'লেভেন্টকে বিপদে ফেলতে' রাজি ছিলেন না। পরবর্তীতে বাকমাস্টার ও আলপোজে তাদের নিজস্ব ফলাফলের খসড়া ও পুরো পরিস্থিতির এক দীর্ঘ বিবরণ অনলাইনে উন্মুক্ত করেন।
এআই সংস্থাগুলোর এই ধরনের অনৈতিক আগ্রাসনের প্রতিবাদে বিশ্বের শীর্ষ গণিতবিদরা এখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। সম্প্রতি এক যৌথ চিঠিতে আন্তর্জাতিক গণিতবিদ দল সতর্ক করে লিখেছেন, এআই কোম্পানিগুলোর লক্ষ্য এবং গণিত সম্প্রদায়ের লক্ষ্য একে অপরের সাথে মারাত্মকভাবে সাংঘর্ষিক। বিষয়টিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে আখ্যা দিয়ে ইউসিএলএ-এর বিশ্বখ্যাত গণিতবিদ টেরেন্স তাও সামাজিক মাধ্যমে তার আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, আমরা এখন দেখলাম যে কারো কোনো সমস্যা নিয়ে কাজ করার স্রেফ একটি গুঞ্জনও ব্যাপক পরিমাণ এআই-চালিত প্রচেষ্টাকে উসকে দিতে পারে, যাতে মূল গবেষণা প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গ সম্ভাবনায় পৌঁছানোর আগেই তাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। এই প্রবণতা হয়তো এখন এমন এক পরিস্থিতির জন্ম দেবে যেখানে গবেষকেরা আর তাদের প্রতিশ্রুতিশীল গবেষণার দিকগুলো বৃহত্তর সমাজের সাথে শেয়ার করবেন না। আর এটি মুক্ত বিজ্ঞানের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যকে পুরোপুরি উল্টে দেবে এবং এই বিষয়ের ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি অপূরণীয় ক্ষতি করবে।
