শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১২ দফা এজেন্ডা তুলে ধরলেন ববি হাজ্জাজ

প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:১৭ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

দেশের শিক্ষা খাতকে আর কেবল ‘খরচের খাত’ হিসেবে নয়, বরং মানবসম্পদের মূল কারখানা, এবং জাতি গঠনের ‘প্রধান প্রকল্প’ হিসেবে দেখবে নবনিযুক্ত সরকার। ২০২৬ সালের নির্বাচনি অঙ্গীকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘ভিশন’ বাস্তবায়নে শিক্ষার মানোন্নয়ন, বাজেট বৃদ্ধি এবং কাঠামোগত সংস্কারে ১২ দফা এজেন্ডা ঘোষণা করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব এজেন্ডা তুলে ধরেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। এসময় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন উপস্থিত ছিলেন।  

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১২ দফা এজেন্ডা 

১. বাজেটের ‘এনভেলপ’ বৃদ্ধি 

ববি হাজ্জাজ বলেন, “আমরা জানি, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রথম শর্ত অর্থায়ন। গত বছরগুলোতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় ১২ শতাংশের আশেপাশে থেকেছে, এবং জিডিপির অনুপাতে তা দেড়-দুই শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করেছে এটা কাঠামোগত সীমা। আমাদের সরকারের বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার— শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। এটা আমাদের নির্বাচনি অঙ্গীকার। আর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডও বলে, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪-৬ শতাংশ এবং মোট সরকারি ব্যয়ের ১৫-২০ শতাংশ— এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হবে।” 

তিনি বলেন, “আমরা কী করবো? অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মাঝারি মেয়াদের বাজেট কাঠামো অনুযায়ী ৩ বছরের ধাপে ধাপে ‘ফিসকাল আপলিফট প্ল্যান’ দেবো।” 

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়লেও শুধু ‘মোট টাকা’ নয়, কোথায় টাকা যাবে সেটাও বদলাতে হবে বদলাতে হবে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বাজেটে সমতা ও শেখার ফলাফল দুটিই প্রধান সূচক হবে।” তিনি আবারও বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর ভিশন হলো— ‘সামাজিক ন্যায় ও দক্ষতা’— দুটো একসঙ্গে।” 

২) উন্নয়ন বাজেটের গুণগত বাস্তবায়ন 

ববি হাজ্জাজ বলেন, “শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, খরচের গুণগত মান বদলাতে হবে। উন্নয়ন বাজেটের একটা বড় অংশ বছরের শেষে হঠাৎ খরচ হয়— এর ফলে বই, নির্মাণকাজ, প্রশিক্ষণ সবকিছুই ‘স্কুল ক্যালেন্ডার’ মিস করে।” 

তিনি জানান, গত অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার উন্নয়ন তহবিলের প্রায় ৫৩ শতাংশ অব্যবহৃত থেকে ফেরত গেছে। একে তিনি শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়, শিক্ষার্থীর সময় ও সুযোগের ক্ষতি বলে উল্লেখ করেন।  

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কমিশনের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি অনুমোদন ও প্রকল্প গেট-কিপিং (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) স্কুল বর্ষপঞ্জির সাথে রি-অ্যালাইন করা হবে। অর্থ বিভাগের ক্যাশ রিলিজ ‘সমান কিস্তি’ না করে মাইলস্টোন-ভিত্তিক করা হবে— টেক্সটবুক, প্রশিক্ষণ, নির্মাণ সবকিছুর আলাদা মাইলস্টোন থাকবে।” 

তিনি জানান, ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা বাধ্যতামূলকভাবে আগেভাগে চালু করে প্রি-প্রকিউরমেন্ট প্ল্যানিং করা হবে যাতে জুনে এসে দরপত্রের ভিড় না হয়। কন্ট্রোলার জেনারেল অব অ্যাকাউন্টসের লেজার পর্যন্ত হিসাব থাকবে, কিন্তু সেই হিসাবের শেষ গন্তব্য হবে ক্লাসরুমে।  

৩) উন্নয়ন ব্যয়কে অগ্রাধিকার: মিড-ডে মিল, আধুনিক ল্যাব এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা। 

প্রতিমন্ত্রী জানান, নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী তারা মিড-ডে মিল, পরিষ্কার টয়লেট, এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। 

৪) ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব: শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল পাঠ-পরিকল্পনা ও লার্নিং এভিডেন্স ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু। 

ববি হাজ্জাজ জানান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে স্কুল পর্যায়ে ডিজিটাল লিটারেসি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সচেতনতা, সাইবার সেফটি এই তিনটি বাধ্যতামূলক সক্ষমতা হিসেবে নিয়ে আসা হবে।  

শিক্ষক ট্যাবের ব্যবস্থা করা হবে জানিয়ে তিনি জানান, শিক্ষক ট্যাবের ভেতর— পাঠ-পরিকল্পনা টেমপ্লেট, প্রশ্নব্যাংক, উপস্থিতি ও শিখন-প্রমাণ (লার্নিং এভিডেন্স) আপলোড করা যাবে যাতে ‘শেখা’ ট্র্যাক করা যায়। 

৫) বহুভাষিক বাংলাদেশ: বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী তৃতীয় ভাষা (আরবি, চীনা, জাপানি বা ফরাসি) শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।  

৬) ইনোভেশন স্পেস: প্রতিটি উপজেলায় স্কুলে ‘রোবোটিক্স ও মেকার কর্নার’ স্থাপন। 

৭) খেলাধুলা বাধ্যতামূলক: মানসিক ও শারীরিক বিকাশে মাধ্যমিক স্তরের টাইমটেবিলে স্পোর্টস পিরিয়ড অন্তর্ভুক্ত করা। 

৮) পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার: মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে আইটেম ব্যাংক ও লার্নিং ট্রাজেক্টরির মাধ্যমে দক্ষতা পরিমাপ। 

৯) শিক্ষায় মানদণ্ড নির্ধারণ: সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার বৈচিত্র্য বজায় রেখে ‘ন্যূনতম শিখন মান’ এক করা। 

ববি হাজ্জাজ বলেন, “প্লুরালিজম থাকবে— কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড এক থাকবে। সরকারি স্কুল, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আলিয়া মাদ্রাসা, কওমি শিক্ষা, কারিগরি সব আছে। এই বৈচিত্র্যকে আমরা সম্মান করি। কিন্তু বৈচিত্র্য মানেই অসম মান হতে পারে না। তাই, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ যৌথভাবে ন্যূনতম শিখন-মানদণ্ড (মিনিমাম লার্নিং স্ট্যান্ডার্ড) নির্ধারণ করবে।” 

কওমি সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, এবং ক্বারি ও আলেমদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি তাদের অঙ্গীকারের অংশ বলেও তিনি জানান। 

১০) ব্রিজ কোর্স: এক শিক্ষা ধারা থেকে অন্য ধারায় যাওয়ার পথ (স্কিল ক্রেডিট) সুগম করা। 

১১) উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘জ্ঞান প্রতিষ্ঠানে’ রূপান্তরের লক্ষ্যে স্টুডেন্ট লোন ও ইনোভেশন গ্র্যান্ট প্রদান। 

১২) পাবলিক ড্যাশবোর্ড: মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে মাসিক ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি ও ক্লাসঘন্টার জবাবদিহি নিশ্চিত করা। 

বাস্তবায়নের সময়সীমা ও পরবর্তী পদক্ষেপ

ববি হাজ্জাজ জানান, কাজগুলো তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী ঈদুল ফিতর পর্যন্ত চলবে ‘ডায়াগনস্টিক রিভিউ’। ঈদের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মতিতে পরিমাপযোগ্য সূচকসহ ‘জাতীয় শিক্ষা রোডম্যাপ’ ঘোষণা করা হবে। ১২ থেকে ৩৬ মাসের মধ্যে মূল্যায়ন পদ্ধতি ও কারিগরি শিক্ষার বড় সংস্কার সম্পন্ন হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “সাংবাদিকদের সামনে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমরা শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি করবো না— আমরা শিক্ষা দিয়ে রাষ্ট্র গড়বো।” 


আমার বার্তা/এমই