রোহিঙ্গা সংকট- ইরান যুদ্ধ ও মানবিক সহায়তায় প্রভাব
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:৩১ | অনলাইন সংস্করণ
ব্রি. জে. (অব.) হাসান মো. শামসুদ্দীন:

ইরান ও আমেরিকা- ইসরায়েল যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে একটি বিশাল ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হচ্ছে এবং এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এই অস্থিতিশীলতা বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতির কারণ এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এই সংকট চলমান মানবিক কার্যক্রমের উপর অতিরিক্ত চাপ ফেলবে এবং এর প্রভাব বিপন্ন মানবগুষ্ঠির অসহায়ত্ব বাড়িয়ে দিবে।
২০২১ সালের পর থেকে সামরিক জান্তা ও আরাকান আর্মির মধ্যেকার সংঘাতে ১৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সংঘাতের কারণে রাখাইনে খাদ্য সরবরাহ, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া এই সংঘাতের অবসান কঠিন। চলমান এই সংঘাত অব্যাহত থাকলে মানবিক বিপর্যয় আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশের উপর চেপে বসা রোহিঙ্গা সংকট ও মানবিক সহায়তার উপর যে চাপ পড়তে পারে তার মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি নেয়ায় বিষয়টি বিশেষ বিবেচনার দাবী রাখে। বাংলাদেশ সরকার এই বিপর্যয় মোকাবেলায় বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোকে সাথে নিয়ে কাজ করছে। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় মিয়ানমারে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন সহজতর করতে বাংলাদেশ থাইল্যান্ডের অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাশা করে। এ প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশে নিযুক্ত থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের সাথে এই সংকট উত্তরণে সহায়তা চেয়েছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস শেন’এর সাথে আলোচনা কালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় তুরস্কের ভূমিকার প্রশংসা করে এবং মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করে।
জাপান সরকার ২০২৫ সালের মার্চ মাসে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর সঙ্গে পাঁচটি নতুন অনুদান সহায়তা প্রকল্পের জন্য মোট ২ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা ১৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দিচ্ছে। এ সহায়তা রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি তাদের আশ্রয়দানকারী বাংলাদেশি জনগণও উপকৃত হবে। বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি জানায় যে, জাপান আশা করে এ সহায়তা বিশ্বব্যাপী মানবিক সাহায্য কমে আসার প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলো চলমান রাখতে সহায়তা করবে। ২০১৭ সাল থেকে জাপান রোহিঙ্গা সংকটে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রায় ২৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা প্রদান করেছে। বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা কমে আসার প্রাক্কালে জাপানের মতো দাতাদের ধারাবাহিক ও দৃঢ় সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সংকট সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশকে নিরলসভাবে সংকট মোকাবেলায় এবং ত্রাণ সহায়তা চলমান রাখতে কাজ করে যেতে হবে।
বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ হলেও উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। রোহিঙ্গা জনসংখ্যা বেড়ে চললেও সহায়তার পরিমান দিন দিন কমে আসছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়নের অভাবে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ১ এপ্রিল থেকে 'নিড-বেসড' পদ্ধতিতে তিন ক্যাটাগরিতে রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা দেয়া শুরু করেছে। আগে রোহিঙ্গা পরিবার মাথাপিছু ১২ ডলার করে সহায়তা পেত, এখন পরিবারভেদে ৭, ১০ ও ১২ ডলার হারে মাসিক খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ১৭ শতাংশ পরিবার পাচ্ছে ৭ ডলার, ৩৩ শতাংশ পাচ্ছে ১২ ডলার এবং বাকি ৫০ শতাংশ পাচ্ছে ১০ ডলার করে। সহায়তার পরিমাণ কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে এবং এর ফলে চলমান মানবিক সংকট আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) জানায় যে, ২০১৭ সালের পর রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বছরে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল থাকত, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪০০ মিলিয়নে। ২০২৬ সালে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন থাকলেও এই অর্থায়ন প্রাপ্তির পরিমানে অনিশ্চয়তা রয়েছে। মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত টম অ্যানড্রুজ রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে বাংলাদেশের প্রতি শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানায়। টম অ্যানড্রুজ কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলে যে, এ ধরনের পদক্ষেপ মানবিক সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।
খাদ্য সহায়তা কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে, পুষ্টিহীনতা বাড়বে এবং অনেকেই জীবিকার সন্ধানে ক্যাম্পের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। এতে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটবে এবং রোহিঙ্গাদের প্রতি স্থানীয়দের নেতিবাচক মনোভাব বাড়বে। সীমান্তের ওপারে মাদকের সহজলভ্যতা থাকায় রোহিঙ্গাদের মাদক পাচার কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা আরও বাড়বে। ক্যাম্পগুলোতে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর উপস্থিতি থাকায় কর্মহীন এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা তরুণ উপার্জনের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে এসব বাহিনীতে যোগ দিতে পারে,এর ফলে স্থানীয় নিরাপত্তার উপর চাপ পড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি হবে।
মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসলে এই সংকট সমাধান আলোর মুখ দেখবে না। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করতে নেয়া উদ্যোগগুলো এখনও কার্যকরী হচ্ছে না। বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থান সোয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদারে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। আরাকান আর্মির প্রধান তোয়ান ম্রাত নাইংও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিনন্দনপত্র পাঠায়। আরাকান আর্মি প্রধান জানায় যে, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্যোগে টেকসই ও বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে পেতে বাংলাদেশ তাদের সাথে কাজ করে যাবে। আরাকান আর্মি জানায় যে, বর্তমানে বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে বন্ধুত্বের একটি নতুন পথ প্রণয়নের সুযোগ এসেছে, সম্পর্ক উন্নয়নে তাদের সদিচ্ছা রয়েছে এবং তারা তা এগিয়ে নিতে আগ্রহী। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে মিয়ানমার সরকার এবং আরাকান আর্মি এবং ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান (ইউএলএ) কাজ করতে চায় বলে জানা গেছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে, রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রতি তাদের আস্থা রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানায় যে, বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে মিয়ানমার সরকার এবং আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ করছে এবং মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের কারণে এখনই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হচ্ছে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা ও সমর্থন জোরদারের পাশাপাশি বাংলাদেশ কূটনৈতিক, আইনী ও মানবিক সব উদ্যোগ চলমান রেখেছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে নিয়মিতভাবে রোহিঙ্গা তথ্য যাচাইকরণ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার ৬ ধাপে আট লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমার সরকারের কাছে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ তিন লাখ ৫৪ হাজার ৭৫১ জনের তথ্য যাচাই করে দুই লাখ ৫৩ হাজার ৯৬৪ জনকে ‘পূর্বে মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
রোহিঙ্গা গণহত্যা অপরাধ সংগঠনের দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ মামলাটি বিচারাধীন। গাম্বিয়ার নেতৃত্বে ১১টি রাষ্ট্র এই মামলা সমর্থন করছে। এই মামলা পরিচালনায় বাংলাদেশ আর্থিক সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ এই আইনী প্রক্রিয়াকে গভীর গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষক করছে এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান উদ্যোগসমূহকে সমর্থন করছে।
আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। মিয়ানমারের ভেতরে উপযুক্ত পরিস্থিত সৃষ্টি হলে রহিঙ্গারা নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফিরতে পারবে। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক স্টেকহোল্ডারদের সাথে নিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য নিজস্ব শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী বাস্তবভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সারা বিশ্বে বর্তমানে এক ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব বাংলাদেশ তথা উন্নয়নশীল দেশগুলোর উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। ইরান যুদ্ধ ও চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট আগামীতে নিয়ন্ত্রণে আসলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব শেষ হতে সময় লাগবে। বাংলাদেশের মত দেশগুলোকে এই সংকট মোকাবেলা করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আগেই বাংলাদেশকে প্রস্তুত থাকতে হবে ও সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
লেখক: মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক।
আমার বার্তা/ব্রি. জে. (অব.) হাসান মো. শামসুদ্দীন/এমই
