সংস্কারের আসল পরীক্ষা কোথায়?

প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৬ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

রাষ্ট্র সংস্কার কথাটি শুনলেই মনে হয়, বুঝি কোথাও বড়সড় হাতুড়ি-ছেনি নিয়ে সংবিধানের দেয়াল ভাঙা হচ্ছে। আসলে সংস্কারের আসল পরীক্ষা অনেক ছোট জায়গায়—একজন নাগরিক সরকারি দপ্তরে গিয়ে ঘুষ ছাড়া কাজটি করাতে পারছেন কি না। 

১৫ সেপ্টেম্বরের সচিবসভা সেই ছোট জায়গাটিকেই বড় করে দেখেছে: একাধিক কর্মস্থলে দুর্নীতির অভিযোগ থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে ব‍্যবস্থা নিতে অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন, মন্ত্রণালয়-বিভাগে দুর্নীতি দমনের উদ্যোগ এবং সেবাপ্রার্থীদের হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

কিন্তু নির্দেশের কালি শুকানোর আগেই লক্ষ্মীপুরের পিডিবি কার্যালয়ের এক নির্বাহী প্রকৌশলীকে ঘিরে ‘দুই কোটি টাকা দেন, সই করে দেব’—এমন একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ঘুরতে শুরু করেছে। পরে তাঁকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে। সরকারি ফাইলের গতি নিয়ে বাঙালির বহু পুরোনো রসিকতা আছে; এখন দেখার বিষয়, দুর্নীতির ফাইলটি তার চেয়েও দ্রুত চলে কি না।

সংস্কারের আরেকটি পরীক্ষাকেন্দ্র অবশ্য সরকারি অফিস নয়—রান্নাঘর। ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম দুই হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার খবর শুনে অর্থনীতিবিদরা হয়তো সরবরাহ-চাহিদার বক্ররেখা আঁকবেন; গৃহিণী তখন হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলবেন, ‘বক্ররেখা থাক, গ্যাসটা আগে আসুক।’ বাজারে সংকট, তার ওপর দাম—এই দুইয়ের জোড়া আঘাত সাধারণ মানুষের জন্য কোনো তাত্ত্বিক সমস্যা নয়। 

একই সঙ্গে জাতীয় ধর্ষণ প্রতিরোধ সেলের ৩৭৩ কর্মী ও কেসওয়ার্কার জানুয়ারি থেকে বেতনহীন—মানুষকে বিপদে সাহায্য করার যাঁদের দায়িত্ব, তাঁদের নিজেদের জীবনই যদি অনিশ্চয়তায় থাকে, তবে রাষ্ট্রের সেবাব্যবস্থার একটু জ্বর আছে বলেই মনে হয়। 

আর বরিশালের সেই নয় বছরের মেয়েটি—চুরির অপবাদে বেঁধে রাখা বাবার মুখে নিজের হাতে খাবার তুলে দিচ্ছে—সামাজিক মাধ্যমকে এক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিয়েছে। প্রশাসন বাবার পুনর্বাসন ও মেয়ের শিক্ষার দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানিয়েছে। আইন তার কাজ করবে; কিন্তু শিশুটির হাত আমাদের বিবেকের কাজটিও করে দিয়ে গেল।

‘জুলাই জাতীয় সনদ’ স্বাক্ষরের পরের অধ্যায়টি বেশ কঠিন—সমঝোতা, সংলাপ এবং বাস্তবায়ন। সনদ লেখা যায় কলমে; কিন্তু তার প্রাণ ঢুকবে প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণে। ইউরোপীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রপতির আহ্বানও এই জায়গায় এসে মিশে যায়: বিদেশি বিনিয়োগকারীকে শুধু কারখানার জমি দেখালেই হবে না, তাকে বোঝাতে হবে যে নিয়মটি কালও নিয়ম থাকবে, আর সরকারি দরজায় তালা খুলতে ‘দুই কোটি’ কোনো গোপন প্রবেশমূল্য নয়। রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা আসলে খুব দামি জিনিস—তবে কিনতে টাকা লাগে না, লাগে নিয়ম মেনে চলা।

রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনও আপাতত পাকিস্তানের আকাশসীমায় অনুমতির ঝামেলায় আটকে গেলেও রোসাটম অক্টোবরে জ্বালানি সরবরাহের কথা জানিয়েছে। পরমাণুর যুগে এসে বোঝা গেল, ইউরেনিয়ামও কূটনীতির ট্রানজিট ভিসা ছাড়া খুব দূর যেতে পারে না! 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শান্তির সঙ্গে যুদ্ধের যেন পাশাপাশি বসবাস—ইরান একদিকে কূটনীতির পথ খোলা রাখছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য ‘ভয়ংকর’ যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা বলছে। 

পৃথিবী বুঝি আমাদের প্রতিদিন একই পাঠ পড়াচ্ছে: বড় রাষ্ট্রনীতি শেষ পর্যন্ত ছোট মানুষের জীবনেই এসে হাজির হয়। তাই সংস্কারের সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা হয়তো খুব সাধারণ—রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের দেখা হলে দুজনের কেউ যেন অন্যজনকে ভয় না পায়।