জিয়া-খালেদার চশমা: রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের দৃশ্যমান প্রতীক?

প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০২ | অনলাইন সংস্করণ

  রানা বর্তমান

রাজনীতি শুধু ক্ষমতা, নির্বাচন, মিছিল, সভা কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাজনৈতিক সংস্কৃতিও। আর সেই সংস্কৃতির রয়েছে নিজস্ব ভাষা, প্রতীক, পোশাক, স্লোগান, ছবি ও বিভিন্ন দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য। সময়ের সঙ্গে এসব বৈশিষ্ট্যের কিছু অংশ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। নির্দিষ্ট কোনো টুপি, শাড়ি, পাঞ্জাবি, ঘড়ি কিংবা চশমার ফ্রেমও একসময় রাজনৈতিক ইতিহাসের দৃশ্যমান দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চশমা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার স্বতন্ত্র চশমার স্টাইলও এমন আলোচনার অংশ। বিষয়টি শুধু কে কী ধরনের চশমা ব্যবহার করেন—এমন সাধারণ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে রাজনৈতিক দলের ঐতিহাসিক নেতৃত্বের দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নতুন প্রজন্মের মধ্যে কতটা টিকে আছে, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।

বিশ্বের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নেতাদের পোশাক ও ব্যক্তিগত স্টাইল সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠতে দেখা গেছে। কোনো নেতার টুপি, পোশাক, চলন কিংবা চশমা ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য হলেও দীর্ঘদিন ধরে জনপরিসরে একইভাবে দৃশ্যমান থাকলে তা জনস্মৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারে।

জিয়াউর রহমানের পোশাক, ব্যক্তিত্ব, সামরিক ও রাষ্ট্রীয় উপস্থিতির পাশাপাশি তাঁর চশমার স্টাইলও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সময়ের দৃশ্যমান পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। আশি ও নব্বইয়ের দশকের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এভিয়েটর ধরনের সানগ্লাসের সঙ্গে তাঁর একটি পরিচিতি তৈরি হয়েছিল বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। একইভাবে খালেদা জিয়ার চশমার ফ্রেম ও ব্যবহারের ধরনও সময়ের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।

একটি রাজনৈতিক প্রজন্ম কোনো নেতাকে শুধু তাঁর বক্তব্য বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্মরণ করে না। তাঁদের হাঁটার ভঙ্গি, পোশাক, চুলের ছাঁট, হাসি, ছবি এবং ব্যক্তিগত স্টাইলও জনস্মৃতিতে জায়গা করে নেয়। সেই জায়গা থেকেই বিএনপির বর্তমান প্রজন্মের নেতাকর্মীদের মধ্যে জিয়া বা খালেদা জিয়ার পরিচিত চশমার স্টাইল আগের তুলনায় কতটা দৃশ্যমান—সে প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।

তবে এর পেছনে শুধু রাজনৈতিক কারণ রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও কঠিন। সময়ের সঙ্গে প্রতিটি প্রজন্মের পোশাক ও ব্যক্তিগত স্টাইলে পরিবর্তন আসে। প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক ফ্যাশন, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রভাব তরুণদের ব্যক্তিগত পছন্দ ও স্টাইলকে দ্রুত পরিবর্তন করছে। ফলে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীরা পূর্ববর্তী প্রজন্মের নেতাদের মতো পোশাক বা চশমা ব্যবহার না করাটাই যে রাজনৈতিক দূরত্বের প্রমাণ, তা বলা যায় না।

একজন তরুণ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাস করলেও তাঁর মতো চশমা ব্যবহার নাও করতে পারেন। আবার কেউ ঐতিহাসিক কোনো নেতার মতো চশমা ব্যবহার করলেও সেই নেতার রাজনৈতিক চিন্তা ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গভীর ধারণা নাও থাকতে পারে। ফলে কোনো ব্যক্তিগত স্টাইলকে রাজনৈতিক আদর্শের বিকল্প হিসেবে দেখা যায় না।

তবে রাজনৈতিক ইতিহাস সংরক্ষণে দৃশ্যমান প্রতীকের গুরুত্ব রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত স্লোগান, পোস্টার, বক্তৃতা ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরে। একই সঙ্গে বই, গবেষণা, সাংস্কৃতিক চর্চা, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, পোশাক, স্মারক ও সংগীতের মাধ্যমেও রাজনৈতিক ইতিহাস মানুষের স্মৃতিতে টিকে থাকে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে জিয়াউর রহমানের চশমা কিংবা খালেদা জিয়ার স্বতন্ত্র চশমার স্টাইলকে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এগুলোকে বাধ্যতামূলক রাজনৈতিক পোশাক হিসেবে ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। বরং রাজনৈতিক ইতিহাসের দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য হিসেবে এগুলো সংরক্ষণ, নথিভুক্ত এবং নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের ভূমিকাও আলোচনায় আসতে পারে। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের পরিচিত চশমার স্টাইল কোনো বিশেষ ঐতিহাসিক বা প্রতীকী আয়োজনে ব্যবহার করা হলে সেটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি দৃশ্যমান বার্তা তৈরি করতে পারে। একইভাবে তারেক রহমান, জোবাইদা রহমান কিংবা জায়মা রহমানের মতো পরিবারের নতুন প্রজন্মের সদস্যরা কোনো বিশেষ উপলক্ষে খালেদা জিয়ার পরিচিত চশমার স্টাইল ব্যবহার করলে সেটিকে পারিবারিক ও রাজনৈতিক স্মৃতির ধারাবাহিকতার দৃশ্যমান প্রকাশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

তবে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কেবল বাহ্যিক অনুকরণের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। কোনো নেতার মতো চশমা পরা বা একই ধরনের পোশাক ব্যবহার করা তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করার প্রমাণ নয়। রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জীবন, রাজনৈতিক ভূমিকা, সময়ের বাংলাদেশ, সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানাশোনা এবং ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক ইতিহাসের ব্যক্তিত্বদের স্মরণ করার ক্ষেত্রে তাই বাহ্যিক প্রতীক যেমন ভূমিকা রাখতে পারে, তেমনি তাঁদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জনসম্পৃক্ততাও গুরুত্বপূর্ণ। চশমা বা পোশাক স্মৃতির একটি দৃশ্যমান প্রতীক হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক আদর্শের প্রকৃত মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত মানুষের কর্মকাণ্ডের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়।

এর পাশাপাশি সানগ্লাস ব্যবহারের একটি বাস্তব দিকও রয়েছে। বাংলাদেশের মতো উজ্জ্বল সূর্যালোক ও ধুলাবালিপূর্ণ পরিবেশে বাইরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা মানুষের জন্য চোখের সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। ভালো মানের UV-protection যুক্ত সানগ্লাস অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শ কমাতে সহায়তা করতে পারে। ফলে সানগ্লাসকে শুধু ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হিসেবে না দেখে প্রয়োজন ও ব্যবহারিক দিক থেকেও বিবেচনা করা যায়।

সব মিলিয়ে, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার চশমার স্টাইলকে রাজনৈতিক আদর্শের প্রতীক হিসেবে সরাসরি দেখার চেয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির দৃশ্যমান স্মারক হিসেবে বিবেচনা করাই বেশি যুক্তিযুক্ত। নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে এসব বৈশিষ্ট্যের ব্যবহার কমে গেলেও তা একা রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে বিচ্ছিন্নতার প্রমাণ নয়। তবে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যমান উপাদানগুলো সংরক্ষণ ও নথিভুক্ত করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি ভিন্ন মাত্রা তুলে ধরা সম্ভব হতে পারে।