কোরআন ও হাদিসে অন্যকে ক্ষমা করার গুরুত্ব
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৩ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে ইসলামে। কোরআন ও হাদিসে ক্ষমা, দয়া ও সহমর্মিতাকে মানবিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে শত্রুদের ক্ষমা করার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে।
মানুষ হিসেবে আমাদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো ভুল করা। কখনো আমরা ইচ্ছা বা পরিকল্পনা ছাড়াই ভুল করি। আবার কখনো জেনেশুনে ও ইচ্ছাকৃতভাবে পাপ করি এবং অন্যের প্রতি অন্যায় করি। তবে কেউ ভুল করে ফেললে তাকে ক্ষমা করা একটি মহান গুণ। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ক্ষমার ভিত্তিতে গড়ে তোলা প্রয়োজন। যারা আমাদের প্রতি অন্যায় করে, তাদের ক্ষমা না করলে আল্লাহর ক্ষমা প্রত্যাশা করা যায় না। পরস্পরকে ক্ষমা করা, এমনকি শত্রুকেও ক্ষমা করা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
কোরআনে আল্লাহ মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেছেন, যারা বড় পাপ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে এবং যখন তারা রাগান্বিত হয়, তখন ক্ষমা করে। (সুরা আশ-শুরা, আয়াত : ৩৭)।
একই সুরার পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন, মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। তবে যে ক্ষমা করে এবং সংশোধন করে নেয়, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে। (সুরা আশ-শুরা, আয়াত: ৪০)।
অন্য এক স্থানে কোরআনে বলা হয়েছে, তোমরা যদি শাস্তি দাও, তাহলে যতটুকু কষ্ট তোমাদের দেওয়া হয়েছে, ততটুকুই শাস্তি দেবে। তবে যদি ধৈর্য ধরো, ধৈর্যশীলদের জন্য সেটিই উত্তম। তুমি ধৈর্য ধরো। তোমার ধৈর্য আল্লাহর সাহায্য ছাড়া সম্ভব নয়। (সুরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৬-১২৭)।
মহানবী (সা.)-এর একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তাকে নয়টি বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে একটি ছিল, যারা তার প্রতি অন্যায় করে, তাদের যেন তিনি ক্ষমা করেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সবচেয়ে ক্ষমাশীল মানুষ। তিনি সব সময় তার শত্রুদের ক্ষমা করতে প্রস্তুত থাকতেন।
মহানবী (সা.) যখন ইসলাম প্রচারের জন্য তায়েফে গিয়েছিলেন, সেখানকার লোকেরা তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। তারা তাকে অপমান করে এবং পাথর ছুড়ে আঘাত করে। আহত ও অপমানিত অবস্থায় তিনি শহর ত্যাগ করেন। একটি গাছের নিচে তিনি আশ্রয় নিলে আল্লাহর একজন ফেরেশতা তার কাছে আসেন। তিনি জানান, তায়েফের লোকেরা আল্লাহর প্রিয় নবীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করায় আল্লাহ তাদের ওপর অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। তাদের ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য তাকে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু মহানবী (সা.) তায়েফের লোকদের রক্ষা করার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। কারণ, তারা যা করেছে, তা তাদের অজ্ঞতার কারণে হয়েছে। তিনি বলেন, হে আল্লাহ, এই লোকদের হেদায়েত দিন। তারা জানত না তারা কী করছে। (সহিহ বুখারি)।
মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (সা.) যখন শহরে প্রবেশ করেন, তখন তার সামনে ছিল তার সবচেয়ে বড় শত্রুদের কয়েকজন। তারা দীর্ঘ দিন তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তার অনুসারীদের নির্যাতন করেছে এবং তাদের অনেককে হত্যা করেছে। তখন তাদের অপরাধের শাস্তি দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা তাঁ হাতে ছিল। বর্ণিত হয়েছে, মহানবী (সা.) তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এখন আমি তোমাদের সঙ্গে কী আচরণ করব বলে তোমরা মনে করো?
তারা প্রতিশোধ ছাড়া আর কিছুই প্রত্যাশা করছিল না এবং ক্ষমার আবেদন জানাল। তখন মহানবী (সা.) বললেন, আজ আমি তোমাদের সেই কথাই বলব, যা ইউসুফ আলাইহিস সালাম তার ভাইদের বলেছিলেন—আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। তোমরা যাও, তোমরা সবাই মুক্ত। এরপর তারা সবাই এসে মহানবী (সা.)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন।
মহানবীর (সা.) সহধর্মীনী হজরত আয়েশা (রা.)-কে নিয়ে অপবাদের ভয়াবহ ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা ক্ষমার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। মদিনার কয়েকজন মুনাফিক তার বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়েছিল। তারা তার পবিত্র চরিত্রে কলঙ্ক লেপনের চেষ্টা করেছিল।
অপবাদকারীদের একজন ছিলেন মিসতাহ, যিনি আয়েশা (রা.)-এর বাবা আবু বকর (রা.)-এর আত্মীয় ছিলেন। আবু বকর (রা.) এই যুবককে আর্থিক সহায়তা করতেন। কিন্তু নিজের মেয়ের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়ার পর আবু বকর (রা.) শপথ করেছিলেন, তিনি আর তাকে কোনো সহায়তা করবেন না।
তখন আল্লাহ আবু বকর (রা.)কে এবং তার মাধ্যমে সব মুমিনকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা সম্পদ ও মর্যাদায় সমৃদ্ধ, তারা যেন আত্মীয়স্বজন, অভাবগ্রস্ত এবং আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের সাহায্য না করার শপথ না করে। তারা যেন ক্ষমা করে এবং উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহও তোমাদের ক্ষমা করুন? নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা আন-নূর, আয়াত: ২২)।
তখন আবু বকর (রা.) তার ঘর থেকে বের হয়ে বললেন, হ্যাঁ, আমি অবশ্যই চাই যে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। এরপর তিনি শুধু মিসতাহকে আগের মতো সহায়তা করা অব্যাহত রাখেননি, বরং তার জন্য বরাদ্দ আরও বাড়িয়ে দেন।
ইসলাম অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার ও শাস্তির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে সমানভাবে দয়া, মমতা ও ভালোবাসার ওপরও জোর দিয়েছে। সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ন্যায়বিচার ও আইন শৃঙ্খলা প্রয়োজন। তবে মানুষের হৃদয়ের ক্ষত সারিয়ে তুলতে এবং পারস্পরিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতেও ক্ষমার প্রয়োজন রয়েছে।
মনে রাখতে হবে, নিজের পাপ ও ভুলের জন্য যেমন আল্লাহর ক্ষমার প্রয়োজন, তেমনি যারা আমাদের প্রতি অন্যায় করে, তাদের প্রতিও আমাদের ক্ষমাশীলতার চর্চা করতে হবে।
