মামলা ও নানা অভিযোগের মধ্যেই ডেসকোর এমডির চুক্তি নবায়নের আলোচনা
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:০৪ | অনলাইন সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক:

ঢাকার বিদ্যুৎ বিতরণী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (ডেসকো)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা, ভূমি দখল, নিয়োগ ও প্রশাসনিক অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার মধ্যেই তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ।
অভিযোগকারীদের দাবি, ডেসকোর বর্তমান নেতৃত্ব এবং কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি বলয় এমডির চুক্তি নবায়নের পক্ষে তৎপরতা চালাচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম আহমেদকে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে তার নিয়োগের মেয়াদ ছিল দুই বছর।
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন: অভিযোগ রয়েছে, এমডি নিয়োগের প্রক্রিয়ায় তিনি প্রাথমিক শর্টলিস্টে ছিলেন না। পরবর্তীতে বিশেষ সুপারিশের মাধ্যমে তিনি নিয়োগ পান বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ডেসকোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের অভিযোগ, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়নি। বরং আগের সময়ের বিভিন্ন বিতর্কিত ও প্রভাবশালী কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রয়েছেন বা নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন।
মামলা ও ভূমি সংক্রান্ত অভিযোগ: শামীম আহমেদের বিরুদ্ধে ভূমি দখল ও জালিয়াতি সংক্রান্ত অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়ের হওয়া সি.আর মামলা নং ০৬/২০২৫-এ তিনি আসামি হিসেবে উল্লেখ রয়েছেন।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের আদালতে সি.আর মামলা নং ৬৮৮/২০২৪ এবং ৭০২/২০২৪ বিচারাধীন রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে মামলাগুলোর বর্তমান আইনগত অবস্থা, অভিযোগের সত্যতা এবং আদালতের সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। মামলায় অভিযুক্ত হওয়া কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে তাকে দোষী হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বেসরকারি আবাসন খাতে কর্মরত থাকার সময়ও তার বিরুদ্ধে ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল। এ বিষয়ে অতীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশাসনে ‘নিজস্ব বলয়’ গঠনের অভিযোগ: ডেসকোতে যোগ দেওয়ার পর শামীম আহমেদ কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়ে প্রশাসনিকভাবে একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তুলেছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত এবং দুর্নীতির অভিযোগ থাকা কয়েকজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে ডেসকো কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে কয়েকজন কর্মকর্তাকে প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন মতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি ও দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে বঞ্চিত করা হয়েছে বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।
স্মার্ট প্রিপেইড মিটার প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন: ডেসকোর একটি স্মার্ট প্রিপেইড মিটার সফটওয়্যার সরবরাহ প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা।
তাদের অভিযোগ, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রথমে প্রায় ১৬৭ কোটি টাকার চুক্তি করা হলেও পরবর্তীতে প্রকল্পের ব্যয় কয়েক ধাপে বাড়তে বাড়তে প্রায় ৩৮৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
অভিযোগকারীদের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী পুরো কাজ শেষ হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। সরবরাহ করা পণ্য ও সেবার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে তারা দাবি করেছেন।
তবে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থ পরিশোধ এবং কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ডেসকোর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হওয়া সম্ভব।
১৬০ কোটি টাকা ছাড়ের অভিযোগ: ডেসকোর একটি চলমান প্রকল্পে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত আর্থিক বিধি অনুসরণ করা হয়নি বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত জুন ও জুলাই মাসে প্রকল্পের অর্থ ছাড় ও পরিশোধের ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
ডেসকোর আর্থিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ নীতিমালার বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সীমার বেশি অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যয়ন এবং অর্থ ও হিসাব বিভাগের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুমোদনের প্রয়োজন হয় বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, আলোচিত অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের অর্থ ও হিসাব বিভাগের ভেতরে আপত্তি রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে অর্থ পরিশোধে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
প্রকল্প পরিচালককে ঘিরেও বিতর্ক: ডেসকোর একটি অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সায়েদুর রহমানকে ঘিরেও নানা অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ডেসকোর গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে প্রশাসনিক সুবিধা নিয়েছেন।
বর্তমানে তিনি নিজেকে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ে তুলে ধরছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
চুক্তি নবায়ন নিয়ে নতুন আলোচনা: ডেসকোর অভ্যন্তরে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে বর্তমান এমডির চুক্তি নবায়ন।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং বোর্ডের কিছু সিদ্ধান্তকে সামনে রেখে শামীম আহমেদের চুক্তির মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
তাদের মতে, বর্তমান এমডির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, বিচারাধীন মামলার তথ্য এবং প্রশাসনিক বিতর্কগুলো বিবেচনায় না নিয়ে চুক্তি নবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
তদন্তের দাবি: ডেসকোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রকল্পের অর্থ পরিশোধ এবং বড় অঙ্কের চুক্তিগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় সেবাপ্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব নির্বাচন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তারা অভিযোগ করেছেন, ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতা, সততা এবং পেশাগত দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ডেসকোর ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণ করা উচিত।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এবং বিদ্যুৎ বিভাগের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
