
রাস্তার ওপর পলিথিন দিয়ে বানানো ছোট্ট টোং ঘরে এক পাশে বাঁধা গরু-ছাগল, অন্য পাশে একটি চৌকি। পরিবারের সবার ঘুম হয় সেই চৌকিতেই। পাশে খোলা আকাশের নিচে মাটির চুলায় রান্না। চারপাশে থইথই পানি। প্রায় ৩ মাস ধরে জলাবদ্ধতায় ভুগছেন যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার বাসীন্দারা।
সরেজমিনে ভবদহ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় এভাবেই রাস্তার ওপর দিন কাটছে যশোরের ভবদহ অঞ্চলের অভয়নগর উপজেলার ডুমুরতলা গ্রামের কয়েকটি পরিবারের। সড়কে পানি ওঠায় নৌকাই এখন তাদের চলাচলের একমাত্র ভরসা। স্থানীয়দের হিসাবে, ৩ উপজেলার প্রায় ২ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছেন।
দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় অনেক পরিবার বসতভিটা ছেড়ে রাস্তা ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি নিয়েই কোনোভাবে দিন কাটাচ্ছেন তারা। অনেক পরিবারের রান্নাবান্না ও খাবারের ব্যবস্থাও সীমিত হয়ে এসেছে। পানি বাড়ায় ব্যাহত হচ্ছে সড়ক যোগাযোগ, কোথাও কোথাও নৌকাই হয়ে উঠেছে মানুষের একমাত্র চলাচলের মাধ্যম।
ডুমুরতলা গ্রামের শিব পদ বিশ্বাস বলেন, আমরা হচ্ছি জলজ প্রাণী, সাপ-ব্যাঙের সঙ্গে আমাদের বসবাস। সরকার ও আমলারা মিলে আমাদের জলজ প্রাণী বানিয়ে রাখছে। আমরা এ জলজ প্রাণীর মতো হয়ে বাঁচতে চাই না।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন তারা। সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রণজীত বাওয়ালীও দীর্ঘ আন্দোলনের পর মারা গেছেন। তবে ভবদহের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান দেখে যেতে পারেননি তিনি। নেতাদের দাবি, দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না হলে কৃষক-শ্রমিকদের নিয়ে আবারও রাজপথে অবস্থান কর্মসূচি দেওয়া হবে।
ভবদহ অঞ্চলের ভবানীপুর গ্রামের ভবদহ নামক স্থানে শ্রী নদীর ওপর ২১ ভেন্ট, ৯ ভেন্ট ও ৬ ভেন্টের স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছিল পাকিস্তান আমলে। একসময় এটি ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম বড় প্রকল্প। সময়ের ব্যবধানে সেই ব্যবস্থাই ভবদহের মানুষের দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের কাজ চললেও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মেলেনি বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, প্রকল্পের ৭৩ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। যেখানে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, সেখানেই কাজ করা হচ্ছে। নদী খননের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে আগামী ৫-৭বছর জলাবদ্ধতা থাকবে না বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে ভবদহের পানি নিষ্কাশনের অন্যতম পথ আমডাঙ্গা খাল সংস্কারে প্রায় ৪৯ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে পৃথক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ঠিকাদার নিয়োগের প্রায় দুই বছর পার হলেও এখনো কাজ শুরু হয়নি। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, জেলা প্রশাসন জমি অধিগ্রহণ করে না দেওয়ায় ঠিকাদার কাজ শুরু করতে পারছেন না।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আমডাঙ্গা খাল সংস্কারসহ পানি নিষ্কাশনের অবকাঠামোগত কাজ দ্রুত শুরু না হওয়ায় ভবদহের জলাবদ্ধতা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। প্রকল্প ও অর্থ বরাদ্দের পরও যদি পানি না কমে, তাহলে ভবদহবাসীর স্থায়ী মুক্তি মিলবে কবে—এ প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের মনে।

