
রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া ইউনিয়নের ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সীমান্তবর্তী গোদারপাড় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। দীর্ঘ ৫৫ বছরের পুরোনো ‘গোদারপাড় বাইতুল আমান জামে মসজিদ’ ভেঙে ফেলা এবং এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুটি ধর্মীয় পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান এখন সংঘাতের রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ঘটনার পেছনে দীর্ঘদিনের আকিদাভিত্তিক মতবিরোধের কথা বলা হলেও, অনুসন্ধানে এর পেছনে কোটি টাকার ভূ-সম্পত্তি ও পার্শ্ববর্তী বেশ কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলের নেপথ্য উদ্দেশ্য রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, বেতবুনিয়া ইউনিয়নের ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত ‘ডাক্তার সোলা’ ও ‘চিকন ছড়া’-এই দুই সমাজের মানুষের যৌথ অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনায় সুদীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে মসজিদটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। ঐতিহাসিকভাবে এটি সুন্নি মতাদর্শ অনুসারী মুসল্লিদের তদারকিতে ছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়।
জুমার খুতবা থামিয়ে ইমামকে বিতাড়ন ও নিয়ন্ত্রণ বদল
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট জুমার নামাজের সময় মসজিদের নিয়মিত ইমাম মনিরুদ্দীন জীবন যখন মিম্বারে বসে খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন একদল উগ্র লোক মসজিদে প্রবেশ করে। তারা ইমামকে খুতবা দেওয়া থেকে জোরপূর্বক বিরত রাখে এবং লাঞ্ছিত করে মসজিদ থেকে বের করে দেয়। এরপরই কওমি মতাদর্শের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু স্থানীয় ব্যক্তি এবং বেসরকারি দাতব্য সংস্থা ‘আল মানাহিল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’ মসজিদটির সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়।
এই ঘটনার পর থেকেই দুই সমাজের সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যে আকিদাগত বিরোধ প্রকাশ্য ও তীব্র আকার ধারণ করে। সুন্নি মতাদর্শের অনুসারীদের একটি বড় অংশকে দীর্ঘদিনের এই চেনা ইবাদতখানা থেকে কার্যত দূরে ঠেলে দেওয়া হয় বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।
৫৫ বছরের পুরোনো কাঠামো ধ্বংস ও নতুন চাল
বিরোধের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে। স্থানীয়দের তীব্র আপত্তি ও সেন্টিমেন্ট উপেক্ষা করে কওমি মতাদর্শের নব্য নিয়ন্ত্রণকারীরা প্রায় সাড়ে পাঁচ দশকের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী মসজিদ ভবনটি সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয়। সেখানে নতুন করে একটি আধুনিক মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে আপাতদৃষ্টিতে দেখা গেলেও, এই ভাঙচুরের নেপথ্য কারণ নিয়ে স্থানীয়দের মনে গভীর সন্দেহের দানা বেঁধেছে।
অভিযোগ উঠেছে, মসজিদটি জরাজীর্ণ বা ব্যবহারের অনুপযোগী ছিল না। মূলত পূর্ববর্তী কমিটির স্মৃতি এবং সুন্নি ভাবধারার শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলতেই তড়িঘড়ি করে এই প্রাচীন স্থাপনাটি ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয় একাংশ। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতির স্পর্শকাতরতার কারণে এসব গুরুতর অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সত্যতা পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মসজিদকে ঢাল বানিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলের মরিয়া চেষ্টা
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই বিরোধ শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিন্নতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মূল সংকটের অবয়ব লুকিয়ে আছে মসজিদের চারপাশের মূল্যবান বাণিজ্যিক জমিতে। মসজিদের মালিকানাধীন ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থিত বেশ কয়েকটি দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে এখন নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।
ভুক্তভোগী স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মসজিদ নিয়ন্ত্রণকারী প্রভাবশালী মহলটি এখন তাদের দোকানগুলো উচ্ছেদ ও নিজেদের দখলে নেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। বহিরাগত মাস্তান ও প্রভাবশালী লোকবল ব্যবহার করে সাধারণ দোকানদারদের ওপর প্রতিনিয়ত মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে করে ওই এলাকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম উচ্ছেদ আতঙ্ক ও তীব্র নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একটি গোষ্ঠী ব্যক্তিস্বার্থ ও কোটি টাকার ব্যবসায়িক সুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার নীলনকশা বাস্তবায়ন করছে।
প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
গোদারপাড় ও আশপাশের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে অবিলম্বে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয়দের স্পষ্ট দাবি, একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে- গোদারপাড় বাইতুল আমান জামে মসজিদের ঐতিহাসিক রেকর্ড ও জমির প্রকৃত আইনি মালিকানা জনসমক্ষে আনা হোক। বলপূর্বক ইমাম বিতাড়ন ও ২০২৪ সালের ৯ আগস্টের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা হোক কোনো প্রকার ব্যক্তিস্বার্থ বা উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি ভাঙা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক।
ধর্মীয় উপাসনালয়ের পবিত্রতা রক্ষা এবং সাধারণ ব্যবসায়ীদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন যদি দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই আকিদাভিত্তিক বিরোধ যেকোনো মুহূর্তে রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।

