
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) মরক্কোর দ্বাদশ আইনসভার প্রথম মেয়াদের প্রথম অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে এসব বিষয়ে কথা বলেন রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ। এ সময় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন যুবরাজ মৌলে আল হাসান, প্রিন্স মৌলে রাশিদ ও প্রিন্স মৌলে আহমেদ।
ভাষণে রাজা বলেন, নতুন আইনসভার মেয়াদ মরক্কোর অর্জিত সাফল্যকে আরও এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি সামাজিক ও আঞ্চলিক বৈষম্য কমিয়ে দেশকে একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের প্রতি ভালোবাসা ও গর্ব কেবল আবেগের বিষয় নয়; বরং এটি দায়িত্ববোধ এবং জাতীয় কর্তব্য পালনের অনুপ্রেরণা। মরক্কোর ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় পরিচয়, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অর্জনের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মরক্কোকে নতুন উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ। বিশেষ করে পানি, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, শিল্পের বিকাশ, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রাজা বলেন, পরিকল্পিত অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন কৌশলগত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
দেশের বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী উদ্যোগ, বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখতে হবে।
মরক্কোর উন্নয়ন পরিকল্পনায় তরুণদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন রাজা। তাঁর মতে, তরুণদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, তরুণদের মধ্যে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা এবং উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ার আত্মবিশ্বাস তৈরি করা প্রয়োজন। এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে তাঁরা স্বাধীনতা, মর্যাদা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবেন।
আঞ্চলিক উন্নয়ন ও জনসেবার মান বাড়াতে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন মরক্কোর রাজা। তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত সমাধান বের করা এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়ানোই আগামী দিনের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ মনে করেন, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণে বিলম্বের কারণে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি নাগরিকদের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা, জনবল ও আর্থিক সম্পদ হস্তান্তরের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব ও এখতিয়ার স্পষ্ট করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ বলেন, দায়িত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে মরক্কো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। তবে অভিবাসন পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যমান সহযোগিতার কাঠামো সময়োপযোগী করে তোলা প্রয়োজন।
বিশেষ করে প্রতিবেশী স্পেনের সঙ্গে অভিবাসন ব্যবস্থাপনা ও অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু আইনি বিধান ও বিচারিক সিদ্ধান্ত অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং আশ্রয়প্রার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করছে।
রাজা বলেন, মরক্কোর আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত ও স্বেচ্ছায় গৃহীত অঙ্গীকারের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো চাপ, হুমকি বা ব্ল্যাকমেইল গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আরও জানান, সহযোগিতার নতুন কাঠামো নিয়ে অংশীদারদের কাছে একটি কৌশলগত রূপরেখা উপস্থাপন করবে মরক্কো। এর লক্ষ্য হবে যৌথ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার করা।
ভাষণের শেষাংশে সংসদ সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ। তিনি বলেন, সংসদীয় দায়িত্ব পালন শুধু রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়, বরং নাগরিকদের সঙ্গে একটি নৈতিক চুক্তিও।
নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণ এবং দেশের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।

