
সচেতনতা ।
কিশোর—শব্দটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দুরন্তপনা, ছটফটে এক উজ্জ্বল চেহারার ছবি। যার অস্থির চাহনি, বিরামহীন ছুটে চলা আর অক্লান্ত পা—সবার মনে আশা জাগায়; অদূর ভবিষ্যতে উদীয়মান কোনো সূর্যের স্বপ্ন দেখায়। এদের আঙুলের ফাঁকে সবসময় শোভা পায় নানা রঙের কলম। হাতে হাজার পৃষ্ঠার গাইড কিংবা গবেষণাপত্র। সুশীল অভিভাবকের মনে আশা জাগরূক রয়—অচিরেই এদের কেউ হবে রোগ নিরাময়ে সফল ডাক্তার, কেউ মানুষের জীবনযাত্রা সহজকারী উন্নত প্রযুক্তির আবিষ্কারক, কেউ হবে দেশ পরিবর্তনের সুচিন্তক রাজনীতিবিদ, নিরবচ্ছিন্ন গবেষক।
কিন্তু যখন কলমের স্থানে জায়গা করে নেয় মাদক-আফিম, সিগারেট কিংবা নেশাজাতীয় কোনো দ্রব্যাদি; হাজার পৃষ্ঠার গবেষণাপত্রের বদলে হাতে উঠে আসে ছুরি-চাপাতি কিংবা দেশীয় কোনো মরণাস্ত্র—তখন অদূর ভবিষ্যতে উদীয়মান রঙিন স্বপ্নের সূর্যটা জাহিলিয়াতের কালো মেঘে ঢাকা পড়ে যায়। অভিভাবকদের আকাশছোঁয়া স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে ধুলোয় গড়াগড়ি খায়। প্রশ্ন জাগে—কেন শান্ত-শিষ্ট সন্তানরা এমন উগ্র হয়ে যাচ্ছে? যাদের হাতে খাতা-কলম, ব্যাট-বল থাকার কথা, তাদের হাতে দেশীয় মারণাস্ত্র কেন? কেন নিভে যাচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রঙিন স্বপ্নের প্রদীপ? শিশু-কিশোরদের এই পরিস্থিতির পেছনে হাতটাই বা কাদের?
গেল মাসে শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন জায়গায় গজিয়ে ওঠা চিহ্নিত কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ৩৩৯টি। এর মধ্যে দেশের প্রাণকেন্দ্র রাজধানীতেই সক্রিয় ১৫৯টি, যাদের থামাতে হিমশিম খাচ্ছে দেশের পুলিশ-র্যাবসহ পুরো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এর নেপথ্যে কী?
কিশোরদের এই ছোট-বড় গ্যাং গড়ে ওঠার পেছনে প্রযুক্তির অপব্যবহার এক বড় কারণ বলে মনে করেন দেশের চিন্তাশীল নাগরিকরা। পাশাপাশি শিশুকাল থেকে কার্যকরী শিক্ষার অভাবে, আদর-শাসনশূন্যতায় বেড়ে ওঠার প্রভাবে তারা সময়ের সাথে সাথে জড়িয়ে যায় নানা অপকর্মে, বেহায়াপনা আর অশ্লীলতায়। অসৎ বন্ধুদের প্ররোচনায় একসময় অল্প বয়সে যোগ দেয় সক্রিয় কোনো অপরাধচক্রে। রাতদিন অন্ধকার জগতে ওঠবস করে গডফাদারদের কথায়; চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, ধর্ষণ করে বেড়ায়; সমাজে ছড়ায় বিশৃঙ্খলা আর নাশকতা। মানুষ হত্যা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি তাদের নিত্যকর্মে পরিণত হয়। দিনশেষে কোনো অন্ধকার গলির ছিমছাম ঘরে সদ্য খুন করা কোনো মানুষের তাজা রক্ত হাতে নেশার জগতে উল্লাসে মত্ত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী এদের ব্যবহার করা হচ্ছে অপরাধচক্রের সামনের সারির সক্রিয় চুনোপুঁটির মতো। যাদের মূল মাথা দেশে আত্মগোপনে থাকা কিংবা ক্ষমতা হারিয়ে বিদেশের মাটিতে বসে হাত চাপড়ানো কিছু বিশৃঙ্খলাবাদী গোষ্ঠী; যাদের মূল টার্গেট—মাঠে না থেকেও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের প্রভাব টিকিয়ে রাখা, হারানো ক্ষমতাবল ফিরিয়ে দেশের সম্পদে নিজেদের নগ্ন থাবা বসানো, দেশকে কাচের চকচকে প্লেটে সাজানো কাবাবের মতো সাজিয়ে উপরমহলের প্রভুদের সামনে পেশ করা।
দেশের এই করুণকালে আমাদের করণীয় কী—তা নিয়ে ভাবতে হবে এখনই। না হয় পরিশেষে ঘুণে ধরা কাঠের, বাতাসে উড়িয়ে নেওয়া ফাঁকির মতো নিজের বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
এখনই সময়—অভিভাবকদের উচিত নিজেদের সন্তানদের পাশাপাশি তাদের বন্ধুদের প্রতিও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা; খারাপ সঙ্গ, মন্দ স্বভাব থেকে তাদের বাঁচানো।
একসময়ের অবহেলিত শিশু-কিশোরদের অনেকেই আজ অন্ধকার জগতের গডফাদার কিংবা কারো ডানহাত-বামহাত। তাই সমাজের এতিম-অবহেলিত শিশু-কিশোরদের নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। ভাবতে হবে তাদের বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে। ধীরে নয়; ভাবনার গতি বাড়াতে হবে বহুগুণ বেশি। কোনো কুচক্রী মহল যেন এদের ঢাল বানিয়ে নিজেদের আখের গোছানোর সুযোগ না পায়। বিশেষকরে প্রযুক্তির অপব্যবহার থেকে তাদের দূরে রাখতে দ্রুততম সময়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে দেশ-বিদেশের বিচক্ষণ এবং দীন-দুনিয়ায় সমান জ্ঞানের অধিকারী মানুষদের পরামর্শও নেওয়া যেতে পারে।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

