ই-পেপার বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা: সংকট, সম্ভাবনা ও টেকসই সংস্কারের সময় এখনই

ডা.মো. আবু কাওছার স্বপন
০২ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৬

​একটি দেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক তার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তি গড়ে ওঠে একটি কার্যকর ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবার ওপর। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচির সফলতা এবং গড় আয়ু বৃদ্ধির মতো ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আজ বহু জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। শহর ও গ্রামের বৈষম্য, দক্ষ জনবলের সংকট, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, সুশাসনের ঘাটতি এবং প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারের কারণে সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

​বাংলাদেশের সংবিধানে স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই অধিকার অনেক ক্ষেত্রেই কেবল নীতিপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি হাসপাতালই প্রধান ভরসা; অথচ অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। দীর্ঘ অপেক্ষা, জনবল সংকট, যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা এবং ওষুধের সীমাবদ্ধতা রোগীদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান, যেখানে চিকিৎসা ব্যয় বহন করা সকলের পক্ষে সম্ভব হয় না। গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের একটি বিশাল অংশ—প্রায় ৬৮ শতাংশ—রোগীদের সরাসরি নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ এবং অনেক পরিবারের জন্য তা অসহনীয়।

​বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় এখনও তুলনামূলকভাবে কম। স্বাস্থ্যকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে। একটি সুস্থ জনগোষ্ঠীই উৎপাদনশীল অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। তাই জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ধীরে ধীরে বাড়িয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল এবং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা জরুরি। এক্ষেত্রে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ (Universal Health Coverage) নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা এবং সরকারের ‘সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি’ (SSK) আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করা প্রয়োজন।

​বাংলাদেশের আরেকটি বড় সমস্যা হলো চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর অসম বণ্টন। রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও জেলা, উপজেলা ও গ্রামীণ অঞ্চলে দক্ষ জনবল আজও অপর্যাপ্ত। অধিকাংশ মানুষ ছোটখাটো সমস্যার জন্য সরাসরি বড় হাসপাতালে ভিড় করেন। তাই কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে শক্তিশালী করে একটি কার্যকর ‘রেফারেল সিস্টেম’ গড়ে তোলা জরুরি, যাতে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমে এবং প্রান্তিক মানুষ ঘরে বসেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পায়।

​স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা সেবার মান নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মান উন্নয়নে সহযোগিতা প্রদান , ভেজাল ওষুধ প্রতিরোধ এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা প্রয়োজন। বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। বাংলাদেশেও টেলিমেডিসিন, ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ নির্ণয় এবং ডিজিটাল হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার মতো উদ্যোগ গ্রহণের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এসব প্রযুক্তি চিকিৎসা সেবাকে আরও দ্রুত, নির্ভুল এবং সহজলভ্য করতে পারে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিকতা ও চিকিৎসা নৈতিকতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

​বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ—যেমন ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যান্সার, কিডনি রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা—দ্রুত বাড়ছে। অথচ আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখনও অনেকাংশে সংক্রামক রোগ মোকাবিলার কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। তাই প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য শিক্ষা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সুস্থ জীবনযাপনের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

​স্বাস্থ্যখাতে বেসরকারি খাতের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্যসেবার একটি বড় অংশ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তবে এই খাতকে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে কার্যকর নীতিমালা ও মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের জন্য সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বও অপরিসীম। আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নত দেশের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে।

​সবশেষে, স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে রোগীকে। একজন রোগী শুধু একটি রোগের নাম নন; তিনি একজন মানুষ, যার প্রয়োজন সম্মান, সহানুভূতি এবং নিরাপদ চিকিৎসা। চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসন এবং নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সেবার মান, মানবিকতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের পথে এগিয়ে চলেছে। এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একটি শক্তিশালী, আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, সুশাসিত এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই আগামী বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও উন্নত জাতি গঠনের মূল চালিকাশক্তি।

লেখক পরিচিতি:

ডা.মো. আবু কাওছার স্বপন,

জেনারেল প্রাকটিশনার,জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ,

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক

অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ চায়না-অ্যালামনাই (অ্যাবকা),

ব্যাবস্হাপনা পরিচালক, লং লাইফ হাসপাতাল,ঢাকা।

Email : [email protected]

সম্পূর্ণ সুস্থ না হলে ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

জ্বর কমে গেলেও সম্পূর্ণ সুস্থতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র না

হামের উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ৭২৪: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

হাম ও এর উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত)

জুলাই-আগস্টে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বাড়তে পারে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

জুলাই-আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তবে তা

হামের উপসর্গে আরও ১ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ৭১৯: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে ওই শিশুটির হাম শনাক্ত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভিসানীতিতে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ, থাকছে ৩৪ ক্যাটাগরি

সম্পূর্ণ সুস্থ না হলে ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

মুনাফাহীন ব্যবসা এক মহৎ চ্যালেঞ্জ, যা জয় করা সম্ভব: ড. মঈন খান

শিক্ষাখাতে ৯৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দেবে ইউনেসকো-ইউনিসেফ

বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে বাংলাদেশের পাশে আছে চীন: রাষ্ট্রদূত

জুনে পোশাক রপ্তানিতে উল্লম্ফন, অর্থবছরে রপ্তানি আয় কম

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর নায়কোচিত সংবর্ধনা পেল জাপান

যৌক্তিক স্থানে উপজেলা সদর স্থাপনের দাবিতে ফটিকছড়িতে বিক্ষোভ

টেকনাফ সীমান্তে ২ কেজি আইস ও জি-৩ রাইফেল উদ্ধার

হজের প্রাক-নিবন্ধনে হজযাত্রীদের যেসব তথ্য দিতে বলেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়

বিশ্ববিদ্যালয়ে টেকসই শিক্ষক উন্নয়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলছে ইউজিসি

এইচএসসির প্রথম দিনে অনুপস্থিত ২৪৭৮৪ শিক্ষার্থী, বহিষ্কার ৭ জন

শাপলা চত্বরের ঘটনায় ইনুর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে: চিফ প্রসিকিউটর

সংবাদ সম্মেলনে হ্যাকিং ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ, তদন্তের দাবি

তিস্তা মহাপরিকল্পনা ছাড়া বন্যা-ভাঙন থেকে মুক্তি মিলবে না: ত্রাণমন্ত্রী

টেকসই উত্তরণের জন্য এলডিসি প্রস্তুতিকাল বাড়াতে চায় সরকার: বাণিজ্যমন্ত্রী

শিগগিরই চালু হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত মিতালী এক্সপ্রেস ট্রেন

মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন করবে সরকার: মাহদী আমিন

‘বীর রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করলেন প্রধানমন্ত্রী

খামেনির জানাজার প্রস্তুতির মাঝেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে ইরানের হুঁশিয়ারি