
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের সেই কৃষ্ণপক্ষীয় রজনীটি ছিল এক বিভীষিকার প্রগাঢ় অন্ধকার। যখন ঢাকার আকাশে পাকিস্তানি হায়েনাদের কামানের গোলা আর বারুদের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল, যখন নিস্পাপ শিশুদের আর্তনাদে বিদীর্ণ হচ্ছিল বাংলার আকাশ-বাতাস ঠিক সেই মুহূর্তে চট্টগ্রামের উপকূলে রচিত হচ্ছিল এক অন্যরকম ইতিহাস। ঘড়ির কাঁটায় তখন ১১টা ৪৫ মিনিট। বাঙালির নিয়তি যখন এক অনিশ্চিত গহ্বরের কিনারে দাঁড়িয়ে, ঠিক তখনই ইতিহাসের পাতা উল্টে দিলেন এক জ্যোতির্ময় পুরুষ। তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। একজন সৈনিকের কাছে শৃঙ্খলা ও আনুগত্যই শেষ কথা। কিন্তু যখন স্বদেশের সাধারন মানুষ দাউদাউ করে জ্বলছে, তখন শৃঙ্খলার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় মাতৃভূমির ঋণ। সেই মধ্যরাতে যখন সংবাদ এল, নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর সশস্ত্র পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তখনই এক নিমেষে বদলে গেল মেজর জিয়ার জীবনদর্শন। তিনি তখন আর কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন না! তিনি হয়ে উঠলেন কোটি কোটি মানুষের রুদ্ধকণ্ঠের সেই অবিনাশী গর্জন।
"আমি মেজর জিয়া বলছি"
সেই ক্রান্তিলগ্নে তিনি মুহূর্তের জন্য বিস্মৃত হলেন পশ্চিম পাকিস্তানে ফেলে আসা প্রিয়তমা পত্নী( বেগম খালেদা জিয়া) , আদরের সন্তান আর সুখের সংসারের মায়া। হৃদয়ের গহীন থেকে ভেসে আসা সেই স্বদেশের আর্তনাদ তাকে ভয়ংকর উম্মাদ করে তুলল। পদের মোহ, জীবনের নিরাপত্তা কিংবা ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের অন্ধকার গহ্বর! কোনো কিছুই তাকে রুখতে পারল না। চট্টগ্রামের ষোলশহরে তিনি যখন উচ্চারণ করলেন সেই ঐতিহাসিক অমোঘ শব্দযুগল "We Rebel!" (আমরা বিদ্রোহ করলাম) তখন তা কেবল একটি ঘোষণা ছিল না। সেটি ছিল বাঙালির শত বছরের পরাধীনতার শিকল ছেঁড়ার প্রথম বজ্রহুঙ্কার।মেজর জিয়ার এই সশস্ত্র দ্রোহ ছিল বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের সেই স্ফুলিঙ্গ, যা মুহূর্তেই সারা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। যখন গোপন বৈঠক আর সমোঝোতায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনিশ্চয়তায় জাতি দিশেহারা, তখন কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের ইথারে ভেসে আসা সেই স্থিতধী কণ্ঠস্বর "আমি মেজর জিয়া বলছি..." বাঙালির ঝিমিয়ে পড়া সাহসে যেন এক অপার্থিব বিদ্যুৎপ্রবাহ বইয়ে দিল । সেই একটি ঘোষণা নিরস্ত্র বাঙালিকে একটি সুসংগঠিত সশস্ত্র বাহিনীতে রূপান্তরিত করার সেই মনস্তাত্ত্বিক আধার হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ইতিহাসের নির্মম সত্য এই যে, সেদিন যদি মেজর জিয়ার মতো কোনো নির্ভীক প্রাণ সর্বশক্তি নিয়ে শত্রুশিবিরে আঘাত না হানতেন, তবে আমাদের স্বাধীনতার সূর্য হয়তো কোনো ধূর্ত ‘সমঝোতা’র অন্ধকারে চিরতরে অস্তমিত হতো। আমরা হয়তো আজও সেই অভিশপ্ত ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামটির গ্লানি বয়ে বেড়াতাম। তাঁর সেই অদম্য সাহস আর আপসহীন বিদ্রোহই আমাদের শিখিয়েছে, যখন জাতির অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে, তখন আপস নয়, সশস্ত্র প্রতিরোধই হলো মুক্তির একমাত্র ধর্ম।
২৫শে মার্চের সেই মধ্যরাতের বিদ্রোহী নায়ক হয়ে রইলেন আমাদের মানচিত্রের সার্বভৌমত্বের প্রথম অতন্দ্র প্রহরী। বীরের মৃত্যু হয় না, তাঁর সাহস প্রতিটি বাঙালির রক্তকণিকা আর লাল-সবুজের পতাকার প্রতিটি ভাঁজে মিশে আছে অক্ষয় হয়ে। তাই কবির ভাষায় লিখতেই হয় " তুমি না থাকলে, হয়তো বাংলাদেশ নামের স্বপ্নটাই কখনো বাস্তবের মাটিতে দাঁড়াত না।
তুমি না থাকলে, মুক্তিযুদ্ধ হয়তো শুধুই আকাঙ্ক্ষা হয়ে থাকত, তার বিজয়ের ইতিহাস লেখা হতো না।
তুমি না থাকলে, হয়তো কেউ অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে রুখে দাঁড়াত না।
তুমি না থাকলে, হয়তো পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জন্য কেউ মৃত্যুকে এত সহজে আপন করে নিত না।
মহান স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা।
লেখক : লেখক ও নৃাটনির্মাতা।
আমার বার্তা/রানা বর্তমান/এমই

