
রাজধানী ঢাকার সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা আবারও একটি পুরোনো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রস্তুতি কি কেবল ঘটনার পরের ব্যবস্থাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সম্ভাব্য সংঘাতের আগাম সংকেতও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হবে?
গত কয়েক দিনে মিরপুর, আদাবর, মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, দখলের চেষ্টা, চাঁদা দাবির অভিযোগ এবং উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাগুলোর ধরন ও পটভূমি এক নয়। কোথাও জমি বা সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ, কোথাও বাড়ি দখলের চেষ্টা, কোথাও চাঁদা দাবির অভিযোগ, আবার কোথাও সরকারি উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা। কিন্তু এসব ঘটনার মধ্যে একটি অভিন্ন প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা প্রস্তুত ছিল?
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে মধ্যরাতে হামলা ও স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনা এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে বিপুলসংখ্যক লোক জড়ো হয়েছিল এবং ভারী যন্ত্র ব্যবহার করে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটিতে চারজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর তথ্যও এসেছে। পরে শাহ আলী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়।
এখানে শুধু একটি স্থাপনা ভাঙচুরের প্রশ্ন নেই। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা হলে তার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপরও। চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুসেবা কিংবা টিকাদানের মতো কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হলে সেটি নিছক সম্পত্তিগত ক্ষতি হিসেবে দেখার সুযোগ কম। কারণ এর সঙ্গে জনসেবার ধারাবাহিকতাও জড়িত।
রাড্ডার ঘটনার মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ে একটি বাড়িতে হামলার অভিযোগ ওঠে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ সেপ্টেম্বর ভোরে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ওই বাড়িতে হামলা চালায়। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে পুলিশ।
এ ঘটনার সঙ্গে চাঁদা দাবির অভিযোগও সামনে এসেছে। আবার মালিকপক্ষের দাবি, বাড়িটি আগে দখলে ছিল এবং পরে পুলিশের সহায়তায় তারা দখল ফিরে পেয়েছিল। অর্থাৎ ঘটনাটির পেছনে সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক চাপ একাধিক বিষয় নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।
একই দিনে মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিং এলাকায় জমি দখলকে কেন্দ্র করে একটি কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। পরে ওই ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়।
এই ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা অপরাধ হিসেবে তদন্ত করা স্বাভাবিক। কিন্তু একই সময়ে একই মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় যদি একই ধরনের সংঘবদ্ধতা, দখলের চেষ্টা, অস্ত্রের ব্যবহার ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সামগ্রিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে এটাই স্বাভাবিক।
প্রশ্নটি কাউকে আগেভাগে অপরাধী বানানোর নয়। প্রশ্ন হলো, কোনো বিরোধ যখন প্রকাশ্য উত্তেজনায় রূপ নেয়, তখন সেটি সংঘর্ষে যাওয়ার আগেই শনাক্ত করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
ঢাকার জমির মূল্য, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং আবাসন-সংকটের কারণে সম্পত্তির বিরোধ নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু আইনি মালিকানা বা দখল নিয়ে বিরোধ যখন দলবদ্ধ শক্তি, অস্ত্র, ভয়ভীতি কিংবা ভাঙচুরের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা হয়, তখন সেটি ব্যক্তিগত বিরোধের সীমা ছাড়িয়ে জননিরাপত্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
আইনগতভাবে কার জমি, কার দখল তার নিষ্পত্তির জন্য আদালত, ভূমি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে। কোনো পক্ষ যদি মনে করে অন্য পক্ষ বেআইনিভাবে সম্পত্তি দখল করেছে, তার প্রতিকারও আইনি পথেই হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে যদি একটি পক্ষ লোকজন জড়ো করে, অস্ত্র নিয়ে যায় কিংবা স্থাপনা ভেঙে দখল নেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে সেখানে পুলিশের দায়িত্ব কেবল মামলা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর গ্রেপ্তার অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই জায়গায় আবার সংঘাতের সম্ভাবনা আছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
কারণ একটি জমি দখলের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরও যদি বিরোধ থেকে যায়, তাহলে পরবর্তী হামলার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একইভাবে কোনো বাড়ি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিরোধ থাকলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে উত্তেজনার মাত্রা, পূর্বের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাব এবং সম্ভাব্য সংঘাতের তথ্য বিশ্লেষণ করা জরুরি।
৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাটি আরেকটি ভিন্ন বাস্তবতা সামনে এনেছে। পুলিশ, সিটি করপোরেশনের কর্মী ও হকারদের মধ্যে সংঘর্ষের পর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও পুলিশ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কথা বলেছেন এবং তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট উচ্ছেদ অভিযান শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয় নয়। এর সঙ্গে বহু মানুষের জীবিকা জড়িত। ফলে অভিযান পরিচালনার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বোঝা প্রয়োজন।
এর অর্থ এই নয় যে ফুটপাত দখলমুক্ত করা যাবে না। বরং উচ্ছেদ হলে সেটি যাতে সংঘর্ষে না গড়ায়, সে জন্য আগাম পরিকল্পনা থাকা দরকার। কোথায় কতজন হকার আছেন, তাদের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, স্থানীয়ভাবে কোনো পক্ষ সংঘাত তৈরি করতে পারে কি না, পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি কী হবে এসব বিষয় আগে নির্ধারণ করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সহজ হতে পারে।
গোয়েন্দা নজরদারি নিয়ে আলোচনা হলেই অনেকের মনে হয়, কোনো বড় ষড়যন্ত্রের তথ্য আগেই জানা গেল কি না। বাস্তবে বিষয়টি আরও বিস্তৃত।
একটি এলাকায় কয়েক দিন ধরে জমি নিয়ে উত্তেজনা চলছে, দুই পক্ষ লোকজন জড়ো করছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, স্থানীয়ভাবে অস্ত্রধারীদের চলাচল বাড়ছে কিংবা বড় কোনো উচ্ছেদ অভিযান হতে যাচ্ছে এসবও ঝুঁকির সংকেত হতে পারে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনেক ঘটনা আগেই শনাক্ত করে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে থামানো হয়। আবার জনবল ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিটি ঘটনা আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না এমন বক্তব্যও এসেছে।
বাস্তবতা হলো, কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থাই শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে ঝুঁকিগুলো শনাক্ত করা সম্ভব, সেগুলো শনাক্ত ও মূল্যায়নের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর?
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছে। মামলা হয়েছে। কোথাও পুলিশ কর্মকর্তা প্রত্যাহার হয়েছেন। কোথাও তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এগুলো আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ।
কিন্তু নাগরিকের নিরাপত্তাবোধ শুধু গ্রেপ্তারের ওপর নির্ভর করে না। মানুষ জানতে চায়, তার বাড়ির সামনে ২০-৩০ জন অস্ত্রধারী লোক এলে পুলিশ কত দ্রুত আসবে। একটি প্রতিষ্ঠান রাতের বেলায় ভাঙচুরের শিকার হলে পরদিন সেখানে নিরাপত্তা থাকবে কি না। কোনো জমি নিয়ে সংঘাতের আশঙ্কা থাকলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নজরদারির মধ্যে রাখা হবে কি না।
এখানেই আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতিরোধমূলক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রের সক্ষমতা বোঝার একটি বড় সূচক হতে পারে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর কতজন গ্রেপ্তার হলো, তার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের আগে কতগুলো সম্ভাব্য সংঘাত প্রতিরোধ করা গেল।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। তবে কোনো অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার আগে তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়া শেষ হওয়া প্রয়োজন।
অপরাধের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হওয়া উচিত ব্যক্তি কী করেছে এবং তার বিরুদ্ধে কী প্রমাণ রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে দায়মুক্তি দেওয়ার কারণ হতে পারে না; আবার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও ন্যায়সংগত নয়।
এই জায়গায় তদন্তের স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ। কারা হামলায় অংশ নিয়েছে, কারা লোকজন জড়ো করেছে, কারা অর্থ বা সরঞ্জাম দিয়েছে, কোনো কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন কি না প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রমাণের ভিত্তিতে বের করতে হবে।
রাজধানীর কোনো এলাকায় রাতের অন্ধকারে ভারী যন্ত্র ঢুকে স্থাপনা ভেঙে ফেলছে, ভোরে অস্ত্র হাতে দলবদ্ধ লোক বাড়িতে হামলা করছে কিংবা দিনের বেলায় একটি কার্যালয় দখলের চেষ্টা হচ্ছে এসব দৃশ্য মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মূল্যায়ন শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে হয় না। নিজের বাড়ি, কর্মস্থল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা আশপাশের এলাকায় মানুষ কতটা নিরাপদ বোধ করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই এখন প্রয়োজন প্রতিটি ঘটনার আলাদা তদন্তের পাশাপাশি একটি সমন্বিত মূল্যায়ন। কোথায় আগাম তথ্য ছিল, কোথায় ছিল না; কোথায় পুলিশ দ্রুত গেছে, কোথায় দেরি হয়েছে; কোথায় প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল; কোথায় সম্পত্তি বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে চলছিল এসব বিষয় বিশ্লেষণ করা দরকার।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা কেবল অপরাধীর হাতে হাতকড়া পরানো নয়। বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে কেউ অস্ত্র, লোকবল বা রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাব ব্যবহার করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাহস না পায়।
ঘটনার পর অভিযান রাষ্ট্রের দায়িত্বের একটি অংশ। কিন্তু ঘটনার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা, সম্ভাব্য সংঘাত ঠেকানো এবং নাগরিককে নিরাপদ রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্বের আরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাজধানীর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই জায়গাটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

