
চার বছরে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশের সরকারকে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে উৎখাত করেছে তরুণ সমাজ জেন-জি। ২০২২ সালে কলম্বো, ২০২৪ সালে ঢাকা এবং ২০২৫ সালে কাঠমান্ডু; এই ধারাবাহিকতায় এবার উত্তপ্ত ভারতের রাজধানী দিল্লি। একটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার অনিয়মের দায়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি নামে পরিচিত একটি ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন গত এক সপ্তাহে হাজার হাজার মানুষকে রাজপথে টেনে এনেছে। এ ধরনের বিক্ষোভকে কেবল ‘তরুণদের আন্দোলন’ বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। দক্ষিণ এশিয়ায় সরকার পতনের পেছনে মূলত চারটি প্রধান পরিস্থিতি কাজ করেছে। বর্তমান ভারতের বাস্তবতায় যার তিনটি ইতোমধ্যেই বিদ্যমান-
১. শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিচ্ছিন্নতা
প্রথম শর্ত হলো উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের বিস্তার। ভারতে প্রতি বছর ৫০ লাখ গ্র্যাজুয়েট বের হলেও কাজের সুযোগ পান মাত্র ২৮ লাখ। ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী বেকার ভারতীয়দের মধ্যে গ্র্যাজুয়েটদের হার ২০১৭ সালের ৪৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৬৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টি গত মে মাসের নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছে, যা ২২.৭ লাখ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছিল। গত পাঁচ বছরে ভারতের ১৬টি রাজ্যে ৪৮টি প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, যার প্রভাব পড়েছে প্রায় দেড় কোটি চাকরিপ্রার্থীর ওপর। ২০২৪ সালে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে আইন পাস হলেও ২০২৬ সালেও একই ঘটনা ঘটেছে। একটি সাধারণ পরিবারের জন্য এই পরীক্ষাগুলোই পেশাগত জীবনে প্রবেশের একমাত্র মই, কিন্তু সেই প্রশ্নপত্র বারবার আগেই কারো কাছে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।
২. বৈষম্যের দৃশ্যমানতা
দ্বিতীয় শর্ত হলো বৈষম্য যা এখন খালি চোখে ও মোবাইলের স্ক্রিনে স্পষ্ট। একজন তরুণ যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ব্যর্থ হওয়ার খবর পড়ছে, তখনই স্ক্রিনের পরের স্ক্রলে দেখতে পায় কোনও রাজনীতিকের ছেলের স্কি ট্রিপের ছবি কিংবা কোনও শিল্পপতির মেয়ের মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ঘোষণা। নেপালের বিক্ষোভকারীরা এদের ‘নেপো কিডস’ বা স্বজনপ্রীতির সন্তান বলে ডাকত, যা শুধু একটি বিদ্রূপ নয়; বরং বৈষম্যের পরিমাপ।
৩. প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থাহীনতা
তৃতীয় শর্ত হলো প্রচলিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়া। যখন অভিযোগ কোনও কাজে আসে না, আদালতে সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হয়, প্রতিনিধিরা ভোটারদের উপেক্ষা করে এবং নির্বাচন কিছুই পরিবর্তন করে না, তখন রাজপথই হয়ে দাঁড়ায় একমাত্র উপায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে ককরোচ জনতা পার্টির অ্যাকাউন্ট পাঁচ দিনের মধ্যে ব্লক করা হয়েছে। দিল্লিতে তাদের অবস্থান ধর্মঘট অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং সোমবার সংসদে তাদের পদযাত্রার অনুমতি দেওয়া হয়নি। নির্দেশ অমান্য করে পদযাত্রা করা হলে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করা হয় এবং পুলিশের লাঠিচার্জে বহু অংশগ্রহণকারী আহত হন।
৪. ক্ষোভ ও অপমান:
চতুর্থ শর্ত হলো রাষ্ট্র তার ব্যর্থতার পর যখন মানুষকে অপমান করে। নেপাল ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করার পাঁচ দিনের মধ্যে সরকার হারায়। বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল চাকরির কোটা নিয়ে আদালতের এক রায় এবং অপমানজনক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। ভারতের আন্দোলন শুরু হয়েছে একটি নির্দিষ্ট অপমানজনক শব্দ থেকে।
শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপাল এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যেখানে নেতারা ছোট কোনও বিষয়ে ছাড় দিতে পারতেন, কিন্তু তারা রাজপথ খালি করার পথ বেছে নিয়েছিলেন। ফলে ছোট দাবিগুলো আর যথেষ্ট থাকেনি এবং শেষ পর্যন্ত তা পুরো সরকার পতনের দাবিতে পরিণত হয়েছিল। সোমবার দিল্লিতেও আন্দোলনটি আর কেবল শিক্ষামন্ত্রী প্রধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
আমার বার্তা/এমই

