
শুক্রবারের ভোরের একটি নিজস্ব স্বভাব আছে। অন্য দিনের সূর্যও আলো দেয়, কিন্তু জুমার সকালের আলো যেন মানুষের কপালে একটু বেশি নরম হয়ে পড়ে। মনে হয়, আকাশ নিজেই আজ মানুষের সঙ্গে একটু আস্তে কথা বলতে চায়। এই নীরব প্রভাতে মনে পড়ে—মানুষ কেবল আহার, নিদ্রা আর কর্মের জন্য জন্মায়নি; তার বিবেক আছে, তার প্রার্থনা আছে, তার জবাবদিহিও আছে। ব্যক্তি যেমন আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে, রাষ্ট্রও একদিন ইতিহাসের দরবারে নিজের হিসাব দেবে।
দেশের আঙিনায় আজ নানা কথার ভিড়। অর্থনীতির নতুন পথরেখা নিয়ে আলোচনা চলছে; আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে নতুন কর্মসূচি, রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং ব্যবস্থার পুনর্গঠন, মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা—সবই যেন এক কঠিন অঙ্কের বিভিন্ন ধাপ। অঙ্কের সৌন্দর্য এই যে, তাকে ফাঁকি দেওয়া যায় না; হিসাব শেষে ভুলটি ধরা পড়েই। রাষ্ট্রের অর্থনীতিও তেমনি—সততার অঙ্কে গরমিল হলে তার বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই এসে পড়ে।
এই জুলাই আবারও আমাদের স্মৃতির দরজায় কড়া নাড়ে। শহীদদের কথা মনে করিয়ে দেয়। ইতিহাসের অদ্ভুত নিয়ম—যাঁরা জীবন দিয়ে পথ দেখিয়ে যান, তাঁদের পদচিহ্ন সময়ের বৃষ্টিতেও মুছে যায় না। মানুষের প্রকৃত উত্তরাধিকার ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; আদর্শ, সাহস আর আত্মত্যাগের দীপ্তি।
বর্ষা এ বছরও তার চিরচেনা উদারতায় জল বিলিয়েছে, কিন্তু আমাদের নগর আর জনপদ সেই উদারতার ভার বইতে শিখেছে কি? কোথাও জলাবদ্ধতা, কোথাও বন্যা, কোথাও মানুষের দীর্ঘশ্বাস। প্রকৃতিকে দোষ দেওয়া সহজ; কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব না করে তাকে জয় করতে চাওয়ার পরিণতি শেষ পর্যন্ত মানুষকেই বহন করতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের কণ্ঠে তাই শুধু অভিযোগ নয়, প্রত্যাশাও শোনা যায়—প্রশাসন আরও দক্ষ হোক, জনসেবা আরও মানবিক হোক, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের দুয়ার আরও উন্মুক্ত হোক, আর রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহির আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠুক। আজকের সম্পাদকীয়গুলোর মর্মবাণীও যেন সেই একই কথা—সুশাসন কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সভ্য রাষ্ট্রের শ্বাস-প্রশ্বাস।
দেশের সীমানা পেরিয়ে তাকালেও মন ভারী হয়ে আসে। মিয়ানমারের উপকূলে শরণার্থীবাহী নৌযানের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ যখন নিজের জন্মভূমিতেই আশ্রয় হারায়, তখন সমুদ্রও তার জন্য নিরাপদ থাকে না। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা দেখিয়ে দেয়, যুদ্ধের আগুন কখনো মানচিত্র দেখে জ্বলে না; তার ধোঁয়া শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রতিটি ঘরেই পৌঁছে যায়—কোথাও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি হয়ে, কোথাও অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছায়া হয়ে।
জুমার এই বরকতময় দিনে আসুন, আমরা অন্তত একটি সিদ্ধান্ত নিই—সত্যকে সুবিধামতো নয়, সত্য বলেই গ্রহণ করব; ন্যায়কে পরিচয়ের মাপকাঠিতে নয়, ন্যায় বলেই সমর্থন করব। কারণ মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার পদে নয়, তার বিবেকে; রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অট্টালিকায় নয়, তার ন্যায়বোধে।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের ইবাদত কবুল করুন, অন্তরে তাকওয়ার আলো জ্বালিয়ে দিন, দেশকে সকল অকল্যাণ থেকে হেফাজত করুন এবং আমাদের এমন প্রজ্ঞা দান করুন, যাতে আমরা ক্ষমতার মোহে নয়, সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে মানুষ ও মাতৃভূমির কল্যাণে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে পারি। জুম্মা মুবারক।
আজকের বিশেষ দোয়া:
আল্লাহুম্মা আরিনা আল-হাক্কা হাক্কান ওয়ারযুকনা ইত্তিবা’আহু, ওয়া আরিনা আল-বাতিলা বাতিলান ওয়ারযুকনাজতিনাবাহু।
“হে আল্লাহ! আমাদের সত্যকে সত্যরূপে দেখান এবং তা অনুসরণের তাওফীক দিন; অসত্যকে অসত্যরূপে দেখান এবং তা থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দিন।”

