
লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলে হেরে বিশ্বকাপের শেষ ১৬ থেকে বিদায় নিয়েছে মিসর। কিন্তু কায়রোর ক্যাফেগুলোতে তখন কান্নার পাশাপাশি শোনা যাচ্ছিল করতালির শব্দ। ম্যাচ শেষে সমর্থকরা দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়েছেন এমন এক দলকে, যারা দেশের ফুটবলকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। কায়রোর হেলিপলিস এলাকার একটি ক্যাফেতে বসে ম্যাচ দেখছিলেন ৩৯ বছর বয়সী ইসমাইল ফাওজি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মন ভেঙে গেছে, কারণ আমরা বিশ্বাস করেছিলাম দল আরও সামনে যাবে। কিন্তু এই দল আমাদের যা দিয়েছে, তা ভেবে আমরা কেবল গর্বই করতে পারি। হ্যাঁ, আমরা হেরেছি, কিন্তু ইতিহাস তো গড়া হয়ে গেছে।’ বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম মিসর কোনো ম্যাচ জিতেছে, গ্রুপ পর্ব পার করেছে এবং নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে।
ক্যাফেতে উপস্থিত ২৭ বছর বয়সী ফারিদা হামদি বলেন, ‘আমরা যেমনটা চেয়েছিলাম, শেষটা তেমন হয়নি। কিন্তু এই খেলোয়াড়দের অর্জন কেউ মুছে দিতে পারবে না। তারা প্রতিটি মিসরীয়কে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছে যে, বিশ্বমঞ্চে আমাদেরও একটা স্থান আছে। এর আগে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করাটাই আমাদের স্বপ্ন ছিল, আর এবার আমরা শেষ ১৬-তে খেললাম। আগামী প্রজন্ম এখন আরও বড় স্বপ্ন দেখবে।’
মিসরের এই ফুটবল রূপকথার রেশ ছুঁয়ে গেছে সীমান্ত পেরিয়ে ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীরেও। যুদ্ধের ক্ষতবিক্ষত গাজায় জেনারেটরের আলো আর তাবু দিয়ে বানানো অস্থায়ী ক্যাফেতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি জড়ো হয়েছিলেন মিসরের খেলা দেখতে। ভাঙা হুইলচেয়ার বা ক্রাচে ভর দিয়ে আহত মানুষরাও এসেছিলেন। মাথার ওপরে ইসরায়েলি ড্রোনের গুঞ্জন উপেক্ষা করেই তারা মেতেছিলেন মিসরের সমর্থনে।
গাজার ৬০ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাদ বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের কাছে মিসর কেবল একটি প্রতিবেশী দেশ নয়; এটি ভালোবাসা, ভাগ করে নেওয়া ইতিহাস আর ত্যাগের প্রতীক।’
মিসরের কোচ হোসাম হাসান আগের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে জয়ের পর মাঠে ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়েছিলেন। এমনকি আটলান্টায় ম্যাচ-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনেও তিনি গাজার মানুষের কষ্টকে ‘বিশ্বের লজ্জা’ বলে আখ্যা দেন।
গাজা সিটির মুসা আবু ইসমাইল (২৮) বলেন, ‘হোসাম হাসান যখন ফিলিস্তিনের পতাকা তুললেন, তখন আমাদের মনে হচ্ছিল বিশ্ব হয়তো গাজাকে ভুলে গেছে। কিন্তু আমেরিকা, মেক্সিকো আর কানাডার এই বিশ্বমঞ্চে গাজা আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে।’
আটলান্টার মাঠে প্রথমার্ধে ইয়াসের ইব্রাহিম এবং দ্বিতীয়ার্ধে মোস্তফা জিকোর গোলে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্ন দেখছিল মিসর। এর মাঝে মেসির পেনাল্টি ঠেকিয়ে দিয়ে নায়ক বনে যান মিসরীয় গোলরক্ষক মোস্তফা শোবের।
কায়রোর বাদরশেইনের এক ক্যাফেতে মেয়েদের নিয়ে খেলা দেখতে আসা উম্মে ওয়াফা বলেন, ‘দুই দিন ধরে মানুষ শুধু এই ম্যাচ নিয়েই কথা বলছিল। তাছাড়া হোসাম হাসান গাজার পাশে যেভাবে দাঁড়িয়েছেন, তা দেখে ঘরে বসে থাকতে পারিনি।’
কিন্তু ম্যাচের ৭৯তম মিনিট থেকে শুরু হয় আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন। ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, লিওনেল মেসি এবং শেষ মুহূর্তে এনসো ফার্নান্দেসের গোলে ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় মাত্র ১৩ মিনিটে।
খেলা দেখে উত্তেজিত হয়ে টেবিল উল্টে ফেলা টুকটুক চালক ইহাব ওমর বলেন, ‘রেফারি ছিলেন চরম অন্যায়কারী! গোল হওয়ার ঠিক আগে সালাহকে ফাউল করা হয়েছিল, কিন্তু ভিএআর রিভিউ নেওয়া হয়নি। ফিফা চায়নি মেসি টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিক।’
কান্নাভেজা চোখে ইহাব আরও যোগ করেন, ‘হারলেও আমরা মেসির দলের বিপক্ষে জীবনের সেরা ম্যাচটি খেলেছি।’
২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কোচ হোসাম হাসানের সমালোচনা করতেন কায়রোর শেখ জায়েদ সিটির মোহাম্মদ আন্তার। তবে এই বিশ্বকাপের পর তার ধারণা পুরোপুরি বদলে গেছে। আন্তার বলেন, ‘আমি কখনোই হোসাম হাসানের ভক্ত ছিলাম না। কিন্তু তিনি এই দলের ভেতর যে লড়াকু মানসিকতা ফিরিয়ে এনেছেন, তা কিংবদন্তি মোহাম্মদ আবুত্রিকার প্রজন্মের পর আর দেখা যায়নি। তার গাজা নীতি এবং ফুটবল কৌশল; উভয়ই আমাদের গর্বিত করেছে।’
আমার বার্তা/এমই

