
সুন্দরবনে মধু আহরণ মৌসুম শুরু হবে ১ এপ্রিল। ইতোমধ্যে বনে ফুটেছে খলিসা, গরান, পশুর, হারগোজাসহ রঙ-বে-রঙের ফুল। সেই সাথে মৌমাছির গুঞ্জনে মুখর বনাঞ্চল। এখন অপেক্ষা ১ তারিখের।
মধু আহরণে বনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত মৌয়ালরা। তবে, উপকূল জুড়েই বনজীবীদের মধ্যে বিরাজ করছে বনদস্যু আংতক। ঘ্রাণ ও স্বাদে অতুলনীয় সুন্দরবনের মধু সংগ্রহ করতে ‘জীবনবাজি’ রাখতে হয় মৌয়ালদের। এতো দিন শুধু নদীতে কুমির আর ডাঙায় বাঘের ভয় ছিল তাদের।
কিন্তু এবার যুক্ত হয়েছে বনদস্যুদের ভয়। মৌয়ালরা বলছেন, কয়েকটি দস্যু দল বনে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বনজীবীদের অপহরণ করে তাদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে অর্থ। পাশাপাশি শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হচ্ছে তারা।
তাই এবার মধু আহরণে যেতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন মৌয়ালরা। এতে যেমন মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ার শংকা রয়েছে, তেমনি জীবিকা সংকটে পড়তে পারে হাজারো মৌয়াল।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হবে, যা চলবে টানা দুই মাস। এ বছর সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় এক হাজার ১০০ কুইন্টাল মধু এবং ৬০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে সুন্দরবন থেকে ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হয়েছিল।
২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮ কুইন্টালে। ২০২৩ সালে আরও কমে হয় ২ হাজার ৮২৫ কুইন্টাল। ২০২৪ সালে কিছুটা বেড়ে ৩ হাজার ১৮৩ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হয়েছিল। আর ২০২৫ সালে সেটি কমে দাঁড়িয়েছিলো ২ হাজার ৭৬ কুইন্টালে, যা ২০২৪ সাল থেকে তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ কম। ২০২৪ সালে প্রায় ৮ হাজার মৌয়াল মধু আহরণে নিয়োজিত ছিলেন। সেটি ২০২৫ সালে নেমে আসে প্রায় ৫ হাজারে।
তবে এবার আরো বেশি কমার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় মৌয়ালরা। কারণ হিসেবে তারা বনে দস্যুতা বৃদ্ধির কথা বলছেন। সাথে সাথে সুন্দরবনের বনদস্যু নির্মূলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের একাধিক মৌয়াল জানান, সুন্দরবনে ডাকাতের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সুন্দরবনে দস্যুদের হাতে অপহরণের ঘটনা বাড়ছেই। এতে করে পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে মৌয়ালরা বনে যাওয়ার উৎসাহ হারাচ্ছেন।
সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার হরিনগরের সিংহড়তলী গ্রামের মৌয়াল আমজাদ হোসেন জানান, তিনি ছোট বেলা থেকে জঙ্গলে যান, বাঁদায় (সুন্দরবনে) কোনো দিন বাঘ-কুমিরের ভয় পাননি। গত বছরও তিনি মধু আহরণ করতে গিয়েছিলেন। জঙ্গল এখন ডাকাতে ভরা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একবার ধরা পড়লে আর রক্ষা নেই। তাই ভয়ে এবার মধু কাটা বাদ দিয়ে এলাকায় দিনমজুরি করবো।
গত বছর সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন একই গ্রামের মৌয়াল নেসার আলী গাজী । তিনি জানান, ডাকাতের ভয়ে আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার অনেক কম মৌয়াল বনে যাবেন। তিনি আরও বলেন, গতবার আমরা একটি নৌকায় ৭ জন মৌয়াল ছিলাম। এবারও আমরা সেই ৭ জন বাঁদায় যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু যে ডাকাতের কথা শুনতেছি তাতে আর বাঁদায় (সুন্দরবনে) যাওয়া হবে না।
সুন্দরবন ডাকাতমুক্ত না হলে এ পেশা ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করছেন দাবি করে মুন্সিগঞ্জের মৌখালী গ্রামের মৌয়াল বশির আলী মোড়ল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাপ-দাদার পেশা হিসেবে সুন্দরবনে মধু কাটতে যায়, কখনো পিছপা হইনি। আগে বেশ কয়েক বছর বনে ডাকাতির চাপ ছিল না। নির্বিঘ্নে মোম-মধু কেটে আনতে পারতাম। তবে এবার শুনতেছি জঙ্গলে (সুন্দরবনে) বিরাট ডাকাত বেড়েছে। ডাকাতির ভয়ে জঙ্গলে (সুন্দরবনে) যাওয়া মনে হয় ছেড়ে দিতে হবে। শুধু আমি না ভয়ে এলাকার অধিকাংশ মৌয়াল এবার জঙ্গলে (সুন্দরবনে) যাবে না বলে জানিয়েছে।
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাঁতিনাখালী গ্রামের মৌয়াল আবুল সানা বলেন, মধু সংগ্রহ আমাদের প্রধান আয়ের উৎস। কিন্তু এখন বনে গেলে জীবন নিয়ে ফিরতে পারবো কিনা সেই ভয় সবসময় কাজ করে। ডাকাতদের হাতে পড়লে সবকিছু হারাতে হয়। ঋণ করে মহাজনদের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে বনে মধু কাটতে গিয়ে ডাকাতদের হাতে ধরা পড়লে সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হতে হয়। মাঝে ঋণের বোঝা বইতে হয়।
অন্যদিকে, অনেকেই অভিযোগ করছেন বনে নিরাপত্তা জোরদারের পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই। মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চললেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না বলে দাবি তাদের। বন বিভাগে বলছে, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন বিভাগ ও কোস্ট গার্ড যৌথভাবে টহল জোরদার করেছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে মৌয়ালদের আতঙ্ক পুরোপুরি কাটাতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. মশিউর রহমান জানান, মৌয়ালদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য তারা কাজ করে যাচ্ছেন। বনাঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি মৌয়ালদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি পরিস্থিতি উন্নত হবে।
আমার বার্তা/এমই

