
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, দেশে কোন প্রতিষ্ঠানকে দেশি আর কোনটিকে বিদেশি বলা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্টতা নেই। উদাহরণ হিসেবে তিনি এস আলম গ্রুপ ও সামিট গ্রুপের কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রয়োজন ও সুবিধা অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠান কখনো দেশি, আবার কখনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নেয়।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর গুলশানের হোটেল সারিনায় ‘কৌশলগত সম্পদে দেশীয় বিনিয়োগের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ (সিএসআর) ও নিউজ পোর্টাল ঢাকা স্ট্রিম অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি।
সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, কোন প্রতিষ্ঠানকে বিদেশি প্রতিষ্ঠান বলব, আর কোন প্রতিষ্ঠানকে দেশি বলব সেটা অনেকক্ষেত্রে স্পষ্ট না। যেমন, এস আলমকে দেশি না বিদেশি বলব? সামিট গ্রুপ কি দেশি না বিদেশি? কারণ যখন দরকার হয়, সুযোগ-সুবিধা নিতে হয়, তখন তারা দেশি হয়ে যায়। আবার যখন পরিবেশ তাদের স্বার্থের প্রতিকূলে চলে যায়, তখন বিদেশি হয়ে যায়। এ জন্য আরও স্পষ্ট আইন দরকার।
দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের উন্নয়নের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ওই দেশগুলো মেধা ও সুশাসনের ভিত্তিতে এগিয়েছে। অথচ বাংলাদেশে দুর্নীতি ও বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।
আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে দেশে ‘হরর স্টোরি’ রয়েছে। তার ভাষ্য, আদানির সঙ্গে হওয়া চুক্তির সব নথি ভারত থেকে তৈরি করে আনা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের ডেকে এনে সই করতে বলা হয়। একইভাবে বিশেষ বাহিনীর সহায়তায় ব্যাংক দখলের ঘটনাও দেখা গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দেশে দুর্নীতির ধরন বদলে গেছে মন্তব্য করে বদিউল আলম বলেন, আগে দৃশ্যমান দুর্নীতি বেশি ছিল, এখন মিলিয়ন ডলারের অদৃশ্য দুর্নীতি হচ্ছে। চুরি-লুটপাট আমাদের অস্থিমজ্জায় মিশে গেছে। এটিই এখন প্রধান শত্রু।
অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও মূল্যায়নে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে কর্মদক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন—কাজের গুণমানই হবে মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি।
দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে জোনায়েদ সাকি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ তখনই ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, যখন প্রযুক্তি হস্তান্তর হয় এবং মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশে থাকে। শুধু মুনাফা বিদেশে চলে গেলে তাতে দেশের দীর্ঘমেয়াদি লাভ হয় না।
তিনি বলেন, সরকার বর্তমানে ব্যবসা সহজ করা ও ব্যবসার খরচ কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। একজন উদ্যোক্তাকে একটি মাঝারি মানের ব্যবসা শুরু করতেও বিভিন্ন অফিসে ঘুরতে হয়, দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও কমে যায়।
সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা, ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজেট অসংগতির বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট প্রকল্পের বদলে সমন্বিত কর্মসূচির আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে জাতীয় অর্থের অপচয় কমে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দেশের জাতীয় মানসিকতায় এক ধরনের সামন্তবাদী সংস্কৃতি ঢুকে গেছে, যার কারণে আমরা সহজেই বশ্যতা স্বীকার করি। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টিকফা চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সবসময় বলা হয় আমাদের কোনো বিকল্প নেই। অথচ নিজেদের স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতা বাংলাদেশেরও রয়েছে।
তিনি বলেন, একতরফাভাবে স্বার্থ বিলিয়ে দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। ব্যবসা-বাণিজ্যে পারস্পরিক স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে।
সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, কোনো চুক্তি যদি রাজনৈতিকভাবে আগেই চূড়ান্ত হয়ে যায়, তাহলে সেখানে একজন সরকারি কর্মকর্তার করার খুব বেশি কিছু থাকে না।
তিনি ১৯৭১ সালের পর নিরাপত্তা ইস্যু ছাড়া বিদেশের সঙ্গে হওয়া সব চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশের আহ্বান জানান। তার মতে, সংবিধান অনুযায়ী জনগণের এসব চুক্তি সম্পর্কে জানার অধিকার রয়েছে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা ঠিক রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে সিএসআরের নির্বাহী পরিচালক সাকিব আনোয়ার বলেন, চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনা নিয়ে বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড ও সৌদি আরবের আরএসজিটির মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। তবে দেশীয় প্রতিষ্ঠান এমজিএস গ্রুপ তাদের চেয়ে বেশি রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।
তার দাবি, এরপরও সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে মূল্যায়ন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।
সাকিব আনোয়ার বলেন, দেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, বিশেষ করে বন্দর খাতে বিদেশি একক আধিপত্যের পরিবর্তে দেশীয় অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অস্বচ্ছ বা প্রতিযোগিতাহীন চুক্তির মাধ্যমে জাতীয় সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দিলে দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত ও আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে।
আমার বার্তা/এমই

